প্রশাসনিক নেই কোন পদক্ষেপ, ঘটছে দুর্ঘটনা : যশোর জেলাজুড়ে মুদীখানা দোকানে পেট্রোল-ডিজেলের বেপরোয়া ব্যবসা

প্রশাসনিক নেই কোন পদক্ষেপ, ঘটছে দুর্ঘটনা : যশোর জেলাজুড়ে মুদীখানা দোকানে পেট্রোল-ডিজেলের বেপরোয়া ব্যবসা

জাহিদ আহমেদ লিটন

যশোর জেলাজুড়ে মুদীখানা দোকানগুলোতে বেপরোয়াভাবে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল ও ডিজেলসহ অতিমাত্রার দাহ্য পদার্থ। যা নিয়ে মাথাব্যাথা নেই জেলা প্রশাসনসহ কোন দপ্তরের। এ কারনে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ইতোমধ্যে মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে এ জাতীয় একটি দোকানে আগুন ধরে এক হতভাগ্য যুবকের নৃশংস মৃত্যু ঘটেছে। মৃতদেহ আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় তার নাম পরিচয় আজো উদ্ধার হয়নি।

যশোরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করে জানা যায়, পেট্রোল ও ডিজেল অনুমোদিত তেল পাম্প ছাড়া বিক্রি করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। আর তেল পাম্পগুলোর অনুমোদন দিয়ে থাকে জেলা প্রশাসন। অথচ যশোর শহরসহ ৮টি উপজেলার বিভিন্ন ছোট-বড় হাট বাজারের সহ¯্রাধিক দোকানে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে পেট্রোল, ডিজেলসহ অতিমাত্রার দাহ্য পদার্থ। যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের নেই কোন সচেতনতাবোধ, তারা রাস্তার পাশে পেট্রোল রেখে বিক্রি করছে। যা থেকে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। অথচ এ নিয়ে প্রশাসনিক কোন দপ্তরের নেই কোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে আন্দোলনের নামে দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে সরকার বিরোধী দুটি রাজনৈতিকদল। সে সময়ে বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল ঢেলে মানুষসহ গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে কুমিল্লায় বাসে নৃশংসভাবে পুড়ে মারা গেছে যশোরের ঠিকাদার পপলু ও তার মেয়ে মাইশা। রাজনৈতিক এ অস্থিরতাকালীন সময়ে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয় গাড়ি ব্যতিত ব্যারেল বা কনটেইনারে পেট্রোল বা ডিজেল বিক্রি করা যাবে না। সরকারি এ নির্দেশ সে সময়ে সকল তেলপাম্পগুলো মেনে চলছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে আবারো পাম্পগুলো থেকে ব্যারেল ও কনটেইনারে তেল বিক্রি শুরু হয়। যা আজো অব্যাহত রয়েছে।

আর এ সুযোগে যশোর শহর ও শহরতলীর অনুমোদনবিহীন সহ¯্রাধিক দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে পেট্রোল ও ডিজেল। যা থেকে ঘটছে দুর্ঘটনা।
গত ২৫ আগষ্ট রাতে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ বাজারে মুদি দোকানে পেট্্েরাল থেকে আগুন লেগে অজ্ঞাত (২৬) পরিচয়ের এক যুবক দগ্ধ হয়ে মারা যায়। এ আগুনে জয়নাল আবেদীন নামে এক ব্যবসায়ীর মুদি দোকান ভস্মিভূত হয়। এছাড়া মোতালেব গাজীর ধানের আড়ৎ ও কাশেম গাজীর সার ও কীটনাশকের দোকানের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মণিরামপুর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা প্রায় দেড়ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকার মামামাল পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মণিরামপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন মিয়া।

এ ঘটনায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া যুবকের নাম পরিচয় আজো উদ্ধার হয়নি। মৃতদেহ পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় তাকে কেউ সনাক্ত করতে পারেনি। তবে একটি বিশেষ মহল ঝামেলা এড়াতে তাকে চোর বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন। জয়নাল আবেদীনের ওই মুদী দোকানে অন্যান্য মালামালের সাথে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি করা হতো। এর থেকেই আগুনের সূত্রপাত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।

যশোর আঞ্চলিক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিস সূত্রে জানা যায়, দেশে যে কোন ব্যবসা করতে হলে প্রতিষ্ঠান মালিককে অবশ্যই ফায়ার লাইসেন্সে নিতে হবে। একইসাথে দোকানে ফায়ার স্টিংগুইসার রাখতে হবে জরুরী অবস্থার জন্য। অথচ এ নিয়ম বেশির ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্টানে মানা হয় না। আর বাজারের তেলের দোকানে অবশ্যই ফায়ার স্টিংগুইসার জরুরী। কিন্তু অবৈধ ব্যবসার কারণে তারা কেউ ফায়ার লাইসেন্স নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। আর চাইলেও তারা অবৈধ এ ব্যবসায় ফায়ার লাইসেন্স পাবে না। বর্তমানে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল ৪ জেলায় মোট ৫ হাজার ৫০৯টি ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। যার সর্বনি¤œ বাৎসরিক ফি ৩শ’ টাকা।

যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের ইন্সেপেক্টর লুৎফর রহমান জানান, মুদীখানা দোকানে পেট্রোল ব্যবসা আইনত অবৈধ। এ জাতীয় অবৈধ ব্যবসা বন্ধে ও ফায়ার লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার জন্য ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার জন্য তারা ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছেন। অচিরেই তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এ ব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনসার উদ্দীন বলেন, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় মিল কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন পেট্রোল ডিজেল রাখার বিশেষ অনুমতি দিয়ে থাকে। এর বাইরে কেউ খোলা বাজারে পেট্রোল ডিজেল বিক্রি করতে পারবে না। যদি কেউ এ ব্যবসা করে থাকে তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সকল থানাগুলোতে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল বলেন, যদি কারো গ্রামাঞ্চলে ডিজেল পেট্রোল বিক্রির অনুমোদন থাকে, তবে তিনি বিক্রি করতে পারবেন। আর অনুমোদন ছাড়া কেউ মুদীখানা দোকানে এ ব্যবসা করলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য