ইরানি শিক্ষার্থীদের বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রজন্ম ডেস্ক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্মুখ যুদ্ধ আপাতত না হলেও দুই দেশের সম্পর্ক এখনও উত্তপ্ত। ইরানের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তো আছেই, এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া ইরানি শিক্ষার্থীদেরও ঢুকতে দিচ্ছে না দেশটি। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন ইরানি শিক্ষার্থীর বৈধ কাগজপত্র থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখা মাত্রই তাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ম্যাসাচুসেটস থেকে মিশিগান, সবখানেই একই অবস্থা। সব বিমানবন্দর থেকেই ফেরত যাচ্ছে ইরানি শিক্ষার্থীরা। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরেট করতে যাওয়া এক শিক্ষার্থীকে গত সোমবার ডেট্রয়েট মেট্রো বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর সপ্তাহখানেক আগে নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীকে বোস্টন থেকে ফেরত পাঠানো হয়।

এমন পরিস্থিতি ভুক্তভোগীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যেও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আমেরিকান কাউন্সিল অন এডুকেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট টেরি হার্টল বলেন, প্রবেশদ্বারে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কী ঘটবে তা নিয়ে ক্যাম্পাসগুলো এখন আগের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন। কারণ এটি খুবই অনিশ্চিত এবং এলোমেলো। আগে তারা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ত যখন বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভিসা পেত। এখন স্বস্তি হচ্ছে যখন তারা ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে পারছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন (সিবিপি) কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের অতিরিক্ত তদন্ত ব্যবস্থায় এমন সব তথ্য সামনে আসছে যা ভিসা স্ক্রিনিংয়ের সময় ধরা পড়েনি। একারণে ভিসা পেলেই কেউ যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারবে এর কোনও গ্যারান্টি নেই। প্রতিদিনই শত শত মানুষের প্রবেশ-অনুমতি বাতিল করা হচ্ছে।

তবে এ পর্যন্ত কতজন ইরানি শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে তা জানায়নি সিবিপি। তাদের দাবি, গোপনীয়তা সুরক্ষার কারণে কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ফলে আইনজীবি ও পরামর্শক সংগঠনগুলোকে মানুষের মুখে মুখে শোনা তথ্যই ব্যবহার করতে হচ্ছে।

পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যালায়েন্স অব ইরানিয়ান আমেরিকানের পরামর্শক আলি রাহনামা জানিয়েছেন, গত আগস্ট থেকে অন্তত ১৭ জন ইরানি শিক্ষার্থীকে ফেরত পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগে সাধারণত বছরে এক-দু’জন এমন পরিস্থিতির মখে পড়ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

আইনজীবীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বোস্টনের লগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অন্তত ১১ শিক্ষার্থীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন অব ম্যাসাচুসেটসের নির্বাহী পরিচালক ক্যারল রোজ বলেন, এটা বোস্টন সিবিপি অফিসের নাকি ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, আমরা জানি না। কারণ এসব হচ্ছে অত্যন্ত গোপনে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসাবমতে, দেশটিতে অন্তত ১০ লাখ বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যার মধ্যে অন্তত ১২ হাজার ইরানি। তবে সাম্প্রতিক তৎপরতায় শুধু ইরানেরই নয়, অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরাও ফেরত গেছেন।

টেরি হার্টল জানান, গত সেপ্টেম্বরে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া একদল চীনা শিক্ষার্থীকেও ফেরত পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, আমরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থা নিয়ে চিন্তিত; সে ইরান, চীন বা জার্মানি যে দেশেরই হোক না কেন।

গত বছরের মে মাস থেকে তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন বিশ্বের ক্ষমতাধর ছয় দেশকে নিয়ে ইরানের সঙ্গে যে পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক চুক্তি করেন গত বছর সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ো যাওয়ার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানের ওপ নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। এরপর সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি তেল স্থাপনায় হামলার পর সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ইয়েমেনে সৌদি জোটের সঙ্গে যুদ্ধরত হুথি বিদ্রোহীগোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর নেপথ্যে ছিল ইরান।

এর মধ্যেই গত ৩ জানুয়ারি বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এসময় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। ইরানের এই সামরিক কমান্ডারকে হত্যার পক্ষে সাফাই গেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিলেন সোলেইমানি।

এছাড়া ইরানের ৫২টি স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিশানায় রয়েছে বলে হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তবে ‘জাতীয় বীর’কে হত্যার জবাব উপযুক্ত সময়ে অবশ্যই দেয়া হবে বলে পাল্টা হুমকি দিয়েছে ইরান। এরই মধ্যে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তির শর্ত না মানার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়ারও অঙ্গীকার করেছে তেহরান।

মন্তব্য