ইভটিজিং

অপরাধ ডায়েরী

রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদনঃ অপরাধ ডায়েরীঃ পর্ব ১৬

শরিয়তউল্লাহ শুভ

যশোরের রামনগর দারুসসুন্নাত মোজাদ্দেদিয়া দাখিল মাদরাসার ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী শিক্ষার্থী হালিমা। একদিন স্থানীয় একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যান হালিমার মা হাজেরা বেগম। এসময় হালিমা ও তার ভাই আব্দুল্লাহ সঙ্গে ছিল।

ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রামনগর এলাকার হাবিবুর রহমানের বাড়ির পাশে তিন রাস্তার মোড়ে আসলে একদল বখাটে হালিমাকে উত্যক্ত করে। বখাটেদেরকে বাধা দিতে গেলে এক পর্যায়ে তারা অপহরণের উদ্দেশ্যে হালিমার হাত ধরে টানাটানি করে। এবং আব্দুল্লাহ ও তার মা বাধা দিলে বখাটেরা তাদেরকে মারপিট করে। পরে তাদের চিৎকারে ভোট কেন্দ্রসহ আশপাশের এলাকার বখাটেরা পালিয়ে চলে যায়। বিষয়টি মীমাংসার আশ্বাস দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য।

কিন্তু তার মীমাংসা করতে বিলম্ব হয়। এদিকে পরদিন রাতে ঘরের ভেতর ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে হালিমা।
অপরাধের দমকা হাওয়ায় নিভে যায় আরো একটি প্রদীপ। ঘটনাটি ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে ঘটে। নড়াইলের একটি স্বনাধন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া (ছদ্মনাম)। একদিন প্রাইভেট পড়া শেষে রুটিন মাফিক বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে।

বাসায় ফেরার পথে নড়াইল শহরের খাদ্য গুদামের কাছে হেলমেট পরিহিত এক অজ্ঞাত ব্যক্তি মোটরসাইকেলযোগে এসে তার শ্লীলতাহানি করে। এ সময় তার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে ওই বখাটে নিজ মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সাদিয়া খুবই ভীত সন্তস্ত্র হয়ে পড়ে।

কিন্তু ইভটিজিং এর বিষয়টি মুখ বুঝে সহ্য না করে সে তার অভিভাবকদেরকে সাথে নিয়ে নড়াইল পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে একটি অভিযোগ করে। এ ধরনের আরো কয়েকটি অভিযোগ আসে নড়াইল পুলিশের কাছে। বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয় নড়াইল পুলিশ। পুলিশ সাদিয়ার কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য নেয়।

এরপর ওই স্থানের সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। সিসিটিভি ফুটেজে ওই বখাটের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর শনাক্ত করে পুলিশ। পরে পুলিশ নিশ্চিত হয় ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি নড়াইলের বেতেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মাহমুদ হাসান সজীবের। পুলিশ আরো নিশ্চিত হয় শিক্ষক সজিব দীর্ঘদিন ধরে ইভটিজিং এর সাথে জড়িত। সে নিজের পরিচয় লুকাতে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের শ্লীলতাহানি ঘটিয়ে থাকে।

অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমানিত হওয়ার ঘটনার পরদিন গভীর রাতে নড়াইল জেলা পুলিশ তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তাকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। গত বছরের জুনমাসে ঘটনাটি ঘটে। অবাক হতে হয় ইভ টিজিংয়ের মত ঘটনার সাথে স্কুল শিক্ষক থেকে শুরু করে এলাকার বখাটে সবাই যুক্ত। এ যেন এক মহামারী আকার ধারন করেছে। আমাদের দেশের যেকোন ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসবের সময় দেখা যায় একদল যুবক একটি কাভার্ডভ্যান ভাড়া করে ভেপু বাজিয়ে বা বক্সে গান বাজিয়ে ছুটে চলছে।

এরা রাস্তায় চলাফেরারত সকল বয়সের মেয়েদেরকে উত্যক্ত করে। কিন্তু কেও কোন প্রতিবাদ করেনা। প্রসাশনেরও কোন হস্তক্ষেপ থাকেনা। স্কুল পড়ুয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মেয়েই কোন না কোনভাবে কমবেশি উত্যক্তের শিকার হয়। আমাদের দেশে ইভটিজিং বা শ্লিলতাহানীর মত ঘটনা ঘটলে মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা বলার প্রবনতা দেখা যায়। কিন্তু যখন পর্দানশীল মাদরাসা শিক্ষার্থী ইভটিজিংয়ের শিকার হয় তখন বলতেই হয় পুরুষের হীনমন্যতাকে আগে দূর করতে হবে।

ইভটিজিংয়ের ঘটনা ও শাস্তির অনুপাত বৃদ্ধি পাওয়া, অবাধ ইন্টারনেট, মাদকের ছড়াছড়ি ও পর্ণোগ্রাফি আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে আমাদের সমাজে ইভটিজিং বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনাগুলোতে লাজ লজ্জার ভয়ে অনেকেই পুলিশের কাছে অভিযোগ করে না।

আবার অভিযোগ করলেও যথাযথ প্রমানের অভাবে পুলিশও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে মীমাংসার ক্ষেত্রে স্বজন প্রীতি দেখা যায়। এজন্য নিজেই নিজের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে৷ তাই সতর্ক হোন সাবধান থাকুন।

মন্তব্য