উকিলের সহযোগী থেকে জামিন জালিয়াতির হোতা

প্রজন্ম ডেস্ক

নিম্ন আদালতে কোনো আসামির জামিন আটকে গেলে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত একটি চক্র। মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র এবং আদালতের কাগজপত্র জালিয়াতি করে উচ্চ আদালত থেকে জামিনের ব্যবস্থা করে দিতেন তারা।

কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে আসামিন জামিন পাইয়ে দেয়া এ চক্রের মূলহোতাসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গ্রেফতাররা হচ্ছেন হারুন-রশিদ ওরফে হারুন, দেলোয়ার হোসেন, এ বি এম রায়হান ও শামীম রেজা।

বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সিআইডি ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।

তিনি জানান, গ্রেফতার সবাই কোনো একসময় উচ্চ আদালতে বিভিন্ন উকিলের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে অন্তত ৫০ জন আসামির জামিনের ব্যবস্থা করে দেন তারা।

ঘটনার সূত্রপাতের বিষয়ে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৪ সালে রাজবাড়ী থেকে চরমপন্থী দলের আঞ্চলিক কমান্ডার ইয়ার আলীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। ২০১৪ সালের নভেম্বরেই মামলার একমাত্র আসামি হিসেবে তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ মামলায় আসামি ইয়ার আলীকে নিম্ন আদালত জামিন নাকচ করে দিলে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। ২০১৭ সালে উকিল মুসরোজ ঝর্ণা সাথির মাধ্যমে একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ইয়ার আলীর ৬ মাসের জামিন দেন।

চরমপন্থী দলের আঞ্চলিক কমান্ডারের জামিন পাওয়ার বিষয়টি খটকা লাগলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহম্মেদ রাজবাড়ীর আদালত থেকে মামলার মূল কাগজপত্র তলব করেন। এরপর সেসব কাগজপত্র এবং উচ্চ আদালতে কাগজপত্র মিলিয়ে দেখার সময় জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে তিনি এসব কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পেশ করলে আসামির জামিন বাতিলসহ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দেন আদালত।

জালিয়াতির বিষয়ে এসএসপি কামরুজ্জামান বলেন, জামিন আবেদনে মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র নকল করে পাল্টে ফেলেন চক্রের সদস্যরা। ওই মামলায় আসামি একজন থাকলেও নকল কপিতে দুইজন আসামি দেখানো হয় এবং প্রধান আসামি ইয়ার আলীকে ২ নম্বর আসামি দেখানো হয়।

পরে ২০১৬ সালে জামিন আবেদনের আইনজীবী ঝর্ণা সাথি ও তার সহযোগী শাহিনুর রহমানকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় দুইজনের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগপত্র দিলে ২০১৭ সালে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিতে পাঠানো হয়।

ধারাবাহিক তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ৯ জানুয়ারি উকিল ঝর্ণা সাথির সহযোগী হারুনকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে তার দেয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ৩ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে চক্রের মূলহোতা দেলোয়ারসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন আদালতের বিচারক, আইনজীবীদের বিপুল পরিমাণ নকল সিল ও বিভিন্ন নথি উদ্ধার করা হয়।

জালিয়াতের প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আসামিদের জামিন পাইয়ে দেয়ার জন্য মোটা অংকের টাকায় চুক্তিবদ্ধ হতেন চক্রের সদস্যরা। ইয়ার আলীর জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর মামলার কাগজপত্র পাঠানো হতো রংপুরে চক্রের সদস্যদের কাছে। সেখানে বসে নকল কাগজপত্র তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হতো। তারপর ঢাকায় অবস্থান করা চক্রের সদস্যরা উচ্চ আদালতের উকিলের মাধ্যমে আদালতে জামিন আবেদন করাতেন।

সিআইডির ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা বলেন, তাদের সঙ্গে জড়িত অন্তত আরও ৫-৬ জনের নাম আমরা পেয়েছি। আশা করছি, খুব শিগগিরই তাদেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য