ছুটিতে ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে দল বেঁধে হাটবাজারে আড্ডা

প্রজন্ম ডেস্ক

মাদারীপুরে থামছে না বাজার ও সাপ্তাহিক হাটের কেনাকাটা। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে জেলার বিভিন্ন স্থানে সকাল-বিকেল নিয়মিত বসছে হাটবাজার। পাশাপাশি নির্ধারিত স্থান ও বন্দরে বসছে সাপ্তাহিক হাট। ফলে হাজারো লোকসমাগমে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েই চলছে।

শহরতলি ও গ্রামগঞ্জের কেউ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করছেন না। টানা ছুটিতে ঢাকা থেকে গ্রামে আসা লোকজন দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছেন। এদের সচেতন করতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। জেলা প্রশাসন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করলে তা মানছে না কেউ। ঢাকাফেরত ব্যক্তিরা বেশি বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছেন। যাতায়াত করছেন হাটবাজারসহ আত্মীয়ের বাড়িতে। করোনাভাইরাসের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে অবাধে হাটবাজার করছেন তারা।

বুধবার (০১ এপ্রিল) সকালে হাট বসার কারণে রাজৈরের টেকেরহাট উত্তরপাড় মহাসড়কে সৃষ্টি হয় যানজট। সড়ক-মহাসড়কে লোক গাদাগাদি করে চলাচল করছেন। ইজিবাইক, ভ্যান, রিকশাসহ ছোট-ছোট যানবাহন চলছে অবাধে।

ঢাকাফেরত ব্যক্তিরা নানাভাবে গ্রামবাসীর সংস্পর্শে আসায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ দৃশ্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে মাদারীপুর সদর ও রাজৈর উপজেলায়। তবে শিবচরের চিত্র ভিন্ন। সেখানে লোকসমাগম তেমন একটা দেখা যায়নি।

শহরের ইটেরপুল, পুরান বাজার, কুলপদ্বী, চৌরাস্তা, মস্তফাপুর, মঠের বাজার, ছিলারচরসহ বিভিন্ন স্থানের হাটবাজারে লোকসমাগম দেখা গেছে। রাজৈর উপজেলার রাজৈর, টেকেরহাট বন্দর, শংকরদী উত্তরপাড়, দক্ষিণপাড়, বন্দর হাট, আমগ্রামসহ গ্রামের হাটবাজারে সামাজিক দূরত্ব তোয়াক্কা করছে না কেউ।

দৈনিক বাজার ও সাপ্তাহিক হাটের দিন থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল রাজৈর ও টেকেরহাট বাজারে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছেন। গোপনে বা প্রকাশ্যে চলছে চায়ের দোকানে আড্ডা। খাবারের হোটেল ও প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় প্রভাবশালী দোকানগুলোর চিত্র একই। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি জেনেও থেমে নেই তারা।

রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বন্দরে বুধবার ও শনিবার সাপ্তাহিক হাট বসে। টেকেরহাট বন্দরের হাট কুমার নদ দিয়ে বিভক্ত। উত্তর ও দক্ষিণপারে সমাগম ঘটে হাজারো মানুষের। উত্তরপারে রাজৈর ও মুকসুদপুর অংশে বিভিন্ন শস্যের হাট বসে। হাটে মাদারীপুর সদর রাজৈর, শিবচর, গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়ার, মুকসুদপুর কাশিয়ানী ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত কৃষক ও ব্যবসায়ী শস্য কেনাবেচা করতে আসেন। এরা সবাই করোনার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এছাড়া গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, ইজিবাইক চলছে স্বাভাবিকভাবে। টেকেরহাট বন্দরে বিশেষ করে মহাজনপট্টিতে মহাজনি সব দোকানপাট চলছে আগের মতোই।

বুধবার সকালে টেকেরহাট উত্তরপারে রবি শস্যের হাটে শত শত ক্রেতা-বিক্রেতা ও রবিশস্যবোঝাই যানবাহনে রীতিমতো যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটে ঘণ্টাখানেক আটকে থাকে জরুরি পণ্যবাহী ট্রাক। প্রতিনিয়ত এ ধরনের হাট-বাজারে হাজার হাজার লোকসমাগম করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

এদিকে টেকেরহাট কাঁচা বাজারে নারীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষণীয়। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়ার আইন মানছে না কেউ। টেকেরহাট বন্দরের সড়ক ও জনপথ অফিসের সামনে প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটা থেকে সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত বসে শ্রমবাজার। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এখানে শত শত নারী ও পুরুষ শ্রমিক এখানে ভিড় জমান। শ্রম বিক্রির জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন এরা। ফলে শ্রমের বাজার থেকেও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এ অবস্থা শুধু রাজৈরের হাটবাজারেই নয়। এ ধরনের লোকসমাগম অব্যাহত রয়েছে সদর উপজেলার শহরের ইটেরপুল, পুরান বাজার, কুলপদ্বী, চৌরাস্তা, মস্তফাপুর, মঠের বাজার, ছিলারচরসহ অন্যান্য স্থানেও। ব্যতিক্রম শুধু শিবচর উপজেলা। শিবচরে কোনো হাটবাজার বসছে না। নিত্যপণ্যের দোকান ও জরুরি সেবা ছাড়া সব বন্ধ। এখানকার চার এলাকা ১৩ দিন ধরে লকডাউনে (নিয়ন্ত্রিত) রয়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে যায় না।

জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌরসভা, সব ইউনিয়ন পরিষদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রচার-প্রচারণা চালালেও সেটি মেনে চলছে না সাধারণ মানুষ। করোনার হাত থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন দফতর থেকে মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে। অথচ কে শোনে কার কথা। হাটবাজার ছাড়াও অকারণে নানা মানুষ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি দেখার জন্য বের হন।

রাজৈর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহাবুবুল হক বলেন, আমরা সার্বক্ষণিক প্রচার-প্রচারণার অংশ হিসেবে মাইকিং করছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিত্যপণ্য ও জরুরি ওষুধপত্র কেনার কথা বলেছি। এরপরও যদি কেউ আইন অমান্য করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুদ্দিন গিয়াস বলেন, হাটবাজার বন্ধ রাখার জন্য ইজারাদারদের বলা হয়েছে। কেউ সরকারি নির্দেশ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ঢাকা থেকে অনেক মানুষ একসঙ্গে গ্রামে আসায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বাজারে লোকসমাগম বেড়ে গেছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ইউনিয়নভিত্তিক অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় করোনাভাইরাসের ঝুঁকি থেকে মাদারীপুরকে রক্ষা করতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। সবার সহযোগিতায় আমরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারব। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঘরে থাকতে হবে।

মন্তব্য