সেই যমজ আনাই-আনুচিংই এখন বাবা-মায়ের মুখের হাসি

প্রজন্ম ডেস্ক

২০০৩ সালের ১ মার্চ খাগড়াছড়ির সাতভাইয়া পাড়া গ্রামের রিপ্রু মঘ ও আপ্রুমা মগিনী দম্পতির ঘরে যখন নতুন অতিথি আসবে তখন খুশির পরিবর্তে মুখ ভার তাদের। নিজেদের জমিজমা নেই। অভাবের সংসার। স্বামী-স্ত্রী দুইজনই অন্যের জমিতে কাজ করে কোনভাবে সংসার চালান।

তিন পুত্র আর দুই কন্যার পর আবার সন্তান! পাঁচ সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেই যেখানে গলদঘর্ম তারা সেখানে আবার নতুন অতিথি। এ যেন দিন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারে সুখের বার্তার বদলে বিষাদের রাগিনী।

এরই মাঝে রিপ্রু মঘ ও আপ্রু মগিনী দম্পতির ঘরে এলো যমজ সন্তান, দুই কন্যা। পরিবারের সদ্য ৭ থেকে হয়ে গেলো ৯। যমজ প্রথম কন্যা ভূমিষ্ঠ হওয়ার দুই মিনিট পর দ্বিতীয় কন্যা। একজনের নাম রাখলেন আনাই মগিনী, আরেকজনের নাম আনুচিং মগিনী। কে জানতেন, যে দুই সন্তান জন্মের পর ভার হয়েছিল রিপ্রু মঘ আর আপ্রুমার মুখ, সেই দুই সন্তানই হাসি ফোটাবেন তাদের মুখে। তাও কি না ফুটবল খেলে।

খাগড়াছড়ির সাতভাই পাড়া গ্রামের একটি পাহাড়ের পাদদেশে আনাই-আনুচিংদের ঘর। একটু দূরেই বড় পাহাড়। বাড়ির পাশে আছে একটি রাবার বাগান। সেখানে এক টুকরো খোলা জায়গায় বল নিয়ে খেলা করত দুই মিনিট আগেপরে পৃথিবীতে আসা যমজ বোন আনাই আর আনুচিং।

একদিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন, ফুটবল খেলে গরীব বাবা-মায়ের হাতে টাকা তুলে দেবেন- এই স্বপ্ন কখনওই ছিল না তাদের। বরং বড় হয়ে অগ্রজ তিন ভাই আর দুই বোনের মতো বাবা-মায়ের কৃষি কাজে সহায়তা করার মানসিক প্রস্তুতিই ছিল তাদের।

কিন্তু এই পাহাড়ি দুই মেয়ের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিলো বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কুল ফুটবল। সাতভাই পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে অভিষেক। আনাই-আনুচিংদের স্কুল পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় পর্যায়ে। কিন্তু সেখানে সেমিফাইনালে হেরে যায় তাদের স্কুল।

তাদের স্কুল হারলেও হারেনি আনাই-আনুচিং। রাঙ্গামাটির মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছিল চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে জাতীয় পর্যায়ে। ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল রাঙ্গামাটির মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার চোখ আটকে ছিল আনাই-আনুচিংয়ের খেলায়।

তাই তো জাতীয় পর্যায়ের দল গড়তে ডাকেন তাদের। আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাদের। প্রাথমিক বিদ্যালয় পেরিয়ে হাই স্কুল পর্যায়ে দুই বোন ফুটবল খেলেছেন একসঙ্গে। ২০১৪ সালে জেএফএ কাপে পারফরম্যান্স দিয়ে তারা কেড়ে নেন নারী ফুটবলের প্রধান কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের চোখ। ডাক পান বাফুফের ক্যাম্পে।

২০১৫ সালে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বের দলেও একসঙ্গে জায়গা করে নেন পাহাড়ি দুই বোন। পরের বছরই তাদের অভিষেক জাতীয় দলে। ভারতের শিলিগুড়িতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে পড়েন লাল-সবুজ জার্সি।

এক সময় বাবা-মায়ের অন্যের জমিতে কাজ করার উপার্জন দিয়েই চলত আনাই-আনুচিংদের সংসার। বড় দুই বোনের বিয়ে হওয়ার পর সংসারের চাপ কমেছে। পরিবারের তিন ছেলেও শুরু করেছেন টুকটাক কাজ। আনাইদের ছোট দুই ভাই কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন, বড় ভাই টমটম চালান। এরপর ফুটবল খেলে দুই বোনের পাওয়া অর্থ।

অনূর্ধ্ব-১৫, ১৬, ১৮ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সাফল্য পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক দফা অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন মেয়ে ফুটবলারদের। আনাই-আনুচিংয়ের অর্জন তাই অন্য যেকোন নারী ফুটবল পরিবারের চেয়ে বেশি।

তাদের বাবা-মা একসময় অন্যের জমিতে কাজ করতেন। এখন নিজেরাই জমি রেখেছেন। খাগড়াছড়ি থেকে আনুচিং বলছিলেন, ‘এখন আমরা বাবা-মাকে অন্যের জমিতে কাজ করতে দেই না। কিছু জমি রেখেছি, কিছু তেভাগা নিয়েছি। এগুলোতে মানুষ দিয়ে কাজ করাই। ফুটবল খেলে পাওয়া টাকার কিছু ব্যাংকে জমা রেখেছি। বাড়িঘর ঠিক করেছি। এখন আমাদের কোনও অভাব নেই।’

যে সন্তানদের জন্মের সময় কাপালে চিন্তার ভাঁজটা বড় হয়েছিল খাগড়াছড়ির ওই মারমা পরিবারের, সেই পরিবারে এখন সদা হাসি। আর সেই হাসি ফুটিয়েছেন ওই দুই জমজ কন্যা আনাই আর আনুচিং। তারা যেন সত্যিই এক বৃন্তে ফোটা দুটি পাহাড়ি ফুল।

মন্তব্য