ঢাকার রাস্তায় লাঠি পার্টি, আতঙ্কিত মানুষ

প্রজন্ম ডেস্ক

শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। মুগদা বিশ্বরোড। হাতে লাঠি নিয়ে টহল দিচ্ছে মাস্ক পরা একদল মানুষ। তারা প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর সদস্য নন। নিজেদেরকে স্বেচ্ছাসেবী দাবি করা এসব লাঠিধারী মানুষ করোনাভাইরাস বিষয়ে সচেনতার নামে লোকজনকে মারধর ও হয়রানি করছিলেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অনেক ‘লাঠি পার্টি’ জনসচেতনতার নামে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। তাদের দৌরাত্ম ঠেকানোর তাগিদ দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

মুগদা বিশ্বরোডে দেখা যায়, কিছু মানুষ অতি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হয়েছেন। তাদের দিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে যাচ্ছে ১০/১২ জনের দলটি। অনেককে মারধর করছেন তারা। তা দেখে রিকশাওয়ালাসহ অন্যরা পালিয়ে যাচ্ছেন।

‘লাঠি পার্টি’র এক সদস্যকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘করোনার বিষয়ে জনসচেতনতার জন্য আমরা স্বেচ্ছায় মাঠে নেমেছি। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে টহল দিয়ে লোকজনকে বাসায় রাখতে চেষ্টা করছি।’

এজন্য কি পুলিশ আপনাদের অনুমতি দিয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘না। আগেই তো বললাম, স্বেচ্ছায়। জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। মারধর না, ভয় দেখাচ্ছি।’ নাম জিজ্ঞেস করামাত্র তারা ওই এলাকা থেকে সটকে পড়েন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মান্ডার এক রিকশাচালক বলেন, ‘সবকিছু জেনেও পেটের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। তারা আমার হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। প্রচণ্ড ব্যথা করছে।’

গ্রুপটি মুগদা থানা শ্রমিক লীগের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তবে তাদের পরিচয় জানা নেই, দাবি করে মুগদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রলয় কুমার সাহা বলেন, ‘মানুষকে ঘরে ফেরাতে আমরা এমন কোনো লাঠি পার্টিকে দায়িত্ব দিইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শুধু মুগদাই নয়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, বাসাবো, মিরপুরের টোলারবাগ ও সাভারের বেশকিছু এলাকায় এ ধরনের লাঠি পার্টি বের হয়েছে। তারা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে থেকে এ কাজ করছেন। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এক বা একাধিক পার্টি গঠন করা হয়েছে। অনেক মানুষ তাদের মারধরের শিকার হচ্ছেন, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ। ত্রাণের জন্য বা জরুরি প্রয়োজনে যারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন তাদের অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে ভয়ে কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

এর আগে টাঙ্গাইলের ছয়আনি বাজারে ওয়ার্ড কাউন্সির আমিনুর রহমান আমিনের মারধরের শিকার হন স্থানীয়রা। দলবল নিয়ে মানুষ পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

তবে রোববার তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইল সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মোশাররফ হোসেন।

রোববার এসব বিষয়ে কথা হয় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এরা অতি উৎসাহী মানুষ। এই সুযোগে তারা মানুষকে হয়রানিসহ বড় ধরনের অপরাধও করতে পারেন। করোনা সচেনতার নামে তাদের আবার ভিন্ন রকম চিন্তাও থাকতে পারে। আবার তারা তো একসঙ্গে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে থাকছেন। তাদের দ্বারাই তো ভাইরাসটি সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী জিয়া রহমান বলেন, ‘এভাবে যদি পার্টি বের হয়, তাহলে সেটি সমাজে খারাপ প্রভাব ফেলবে। সেক্ষেত্রে ভাইরাসের প্রার্দুভাব শেষ হয়ে গেলেও তাদের এ দলবদ্ধতা থাকবে। তারা এক সময় এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারই নয়, অর্থ উর্পাজনের জন্য নানা অপরাধ করতে পারে। কোনভাবেই যেন এ ধরনের পার্টির আবির্ভাব না হতে পারে, সেজন্য পুলিশকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে এদের দৌরাত্ম্যে একসময় সমাজে খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হবে।’

মন্তব্য