পৃথিবী দেখা হলো না

প্রজন্ম ডেস্ক

প্রকৃতির কোলে অপার আনন্দে মিলন হলো মা পাখি আর বাবা পাখিটার। প্রকৃতির অপার্থিব নিয়মে দুটি প্রাণ একসূত্রে বেঁধে গেলো। শুরু হলো জীবনের নতুন অধ্যায়। অনাগত সন্তানের আগমনের অসীম সুখে আত্মহারা দুটো পাখিই।

সন্তানদের এই অপরূপ পৃথিবীতে আনতে তারা দু’জনে মিলে শুরু করলো সংসার গোছানোর কাজ। বাবা-মা দু’জনে মিলে খুব যত্ন করে ঘর বাঁধতে শুরু করে। এত যত্ন করে ঘর বাঁধে তারা, যাতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের সুখের সংসারে সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট বয়ে না নিয়ে আসে। এত উঁচুতে ঘর বাঁধে, যাতে কোনো শত্রুর আক্রমণে সুখের সংসার ছিন্ন-ভিন্ন না হয়ে যায়।

একে একে সাত দিনের পরিশ্রমে বাসা বানানোর কাজ শেষ করার পর মা পাখিটি ডিম পাড়তে বসে। একে একে চারটা ডিম পাড়ার পর সন্তান লালল-পালনের গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের উপর। বাবা পালা করে পাহারা দেয়, আশেপাশে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়, মা পাখির জন্য খাবার নিয়ে আসে। মা পাখি তখন বাবার অতি যত্ন আর দায়িত্বশীলতায় সুখের সাগরে হারিয়ে যায়।

তারপর হঠাৎ একদিন বাবা পাখি খাবার আনতে যায়, এক দুষ্টু লোকের কৃষি খেতে। ঐ কৃষক তার ফসলে অতিরিক্ত কীটনাশক দিয়েছিল। কিন্তু, বাবা পাখিটা দুষ্টু লোকের তো আর দুষ্টুমি বোঝে না, বোঝে না এই পৃথিবীর মানুষ নামের প্রাণীদের হিংস্র থাবা, লোভ আর হিংসা। কৃষকের ক্ষেতের এত এত খাবার দেখেই সে খুঁশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। আর ভাবতে থাকে মা পাখিটা আজ খাবার দেখে এত খুঁশি হবে, এত খুঁশি হবে যে ভাবতেই কেমন কেমন শিউরে ওঠে তার মন।

সন্তান হওয়ার আর বেশিদিন সময় নেই, এ সময় এত খাবারের খোঁজ পাওয়া অতি আনন্দের। এরপর, দু’জনে মিলে মনের সুখে খাবার কুড়াবো, কত মজা যে হবে! এমন হাজারো কথা ভাবতে থাকে বাবা পাখিটা। যতই ভাবতে থাকে ততই ভালো লাগে তার। খুঁশিতে গদগদ করে গিলে নেয় কিছু খাবার আর তখনই বিষের তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়, ডানা ঝাপটায় আর নিস্তেজ হতে থাকে সে, আর ভাবতে থাকে মা পাখিটার কী হবে? কী করে বাঁচাবে তাদের সন্তানেদের? তাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা কেমন করে সইবে? এসব ভাবে আর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। জীবনটা কত অদ্ভুত! এত সুখের সংসারে মুহূর্তের মধ্যেই কালো ছায়া নেমে এলো। সুখের ভাবনাগুলো যেন মুহূর্তেই কোথায় মিলিয়ে গেলো।

এদিকে সকাল, দুপুর, বিকাল ৫-৬ বার খাবার নিয়ে আসে বাবা পাখি, কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখনো খাবার নিয়ে ফিরেনি তার সন্তানদের বাবা। প্রতিবারই আশায় বুক বাঁধে মা পাখি, কিন্তু আশা নিরাশা হয়েছে প্রতিবার। এবার আর চিন্তায় ঠিকমতো ডিমে তা দিতে পারে না সে। অসীম দুশ্চিন্তায় কেমন ছটফট ছটফট করে তবুও সন্তানকে বাঁচাতে ঠিকঠাক ডিমে তা দিতে হয় তার। অন্যদিকে সে সারাদিনের উপাস, না খাওয়ার যন্ত্রণাও তাকে তীব্র কষ্টে ভুগাচ্ছে৷ বাবা ছাড়া মা এতটাই অসহায় হয়েছে, যে বলার বাইরে। তার সন্তানদের বাঁচানো নিজের খাবার সংগ্রহ, বাবাকে খুঁজে না পাওয়া দুশ্চিন্তা সব যেন মায়ের উপর এক কঠিন করুণ অবস্থা তৈরি করেছে।

বাবা পাখির চিন্তায় সারারাত ঘুম হয়নি তার। কষ্টে বুক ফেটে গেছে, তবুও একবিন্দুও ডিমে তা দেওয়া থেকে সরে যায়নি। সন্তান বাঁচাতে হলে তো তাকেও বাঁচতে হবে, তাই নিজের খাবারের খোঁজে কিছু সময়ের জন্য ডিম ছেড়ে বের হতে হয় তার। মা পাখিটা যখনই ডিম ছেড়ে বের হয়, কিছু সময় বাবা পাখিটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, তারপর ডিম নষ্ট হওয়ার ভয় তো আছে। কিন্তু, খোঁজ আর পাওয়া যায় না বাবা পাখির। অসহায়, তীব্র বেদনার্ত, দিন অতিবাহিত হয় মা পাখির।

ঘটনার ৪ দিন পর একে একে ৪টা ডিম থেকে ৪টা ফুটফুটে সন্তান বের হয়। সন্তানদের দেখে খানিক কষ্ট ভুলে যায় মা। তাদের ঘিরেই নতুন করে নতুন আনন্দে বাঁচার স্বপ্ন দেখে সে। বাচ্চাদের কিচিরমিচির শব্দ তাকে বাঁচার জন্য নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। আবারো সংসারে কিছুটা খুশির ঝলক আসে। মাঝে মাঝে বাবা পাখিটার কথা ভাবে সে, আর কেমন যেন হয়ে যায়। সে ভাবতে থাকে এদের বাবা যদি বেঁচে থাকতো কতই না খুঁশি হতো। এদের জন্য আমরা দুজনে অতি আনন্দে খাবার নিয়ে আসতাম। কী সুন্দর দিন হতো আমাদের। এসব ভেবে খানিক সময়ে দুঃখের সাগরে ভেসে যায়। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। বেঁচে থাকার লড়াই সংগ্রামে আবারো ভবিষ্যতে ফিরে তাকায়।

একদিন সন্তানের জন্য খাবার আনতে গিয়ে এবার শিকারির জালে জড়িয়ে যায় মা পাখিও। তীব্র বাঁচার আঁকুতি, সন্তানদের বাঁচানোর আর্তনাদ শুনতে পারে না নরপশু শিকারিরা। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেও বাঁচতে পারলো না মা পাখি। এদিকে তার সন্তানদের বয়স কেবল ২দিন। উড়তে পারার শক্তি অর্জন করা তো দূরে থাক, এখনো চোখই ফুঁটে নাই তাদের। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, জন্মের আগে তাদের বাবাকে মানুষ নামের স্বার্থবাদী কীটদের হিংস্রতায় হারাতে হয়েছে, জন্মের পরে এই লোভীদের জন্য মাকেও হারাতে হলো। এখনো চোখ খুলে বাবা-মাকে দেখারই স্বাদ হলো না, দু’জনই তাদের ছেড়ে বিদায় নিয়েছে।

এদিকে খাবারের অভাবে ভুগতে থাকা বাচ্চাগুলোর তীব্র চিৎকার কেউ শুনে না, শুনে না ক্ষুধার যন্ত্রণা। অবশেষে চিৎকার করতে করতে হাড্ডিসার কঙ্কালময় চারটি ফুটফুটে পাখির ছানা তাদের বাসাতে পড়ে রইল। বাবা-মায়ের এক সপ্তাহের যত্নে গড়া বাসাটা যত্নেই আছে, প্রাকৃতি দুর্যোগেও বাসাটা ভেঙ্গে যায়নি। কিন্তু, পাখিগুলো আর নেই।

মায়ের হাজার কষ্টেও সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে বাসায় ফিরে এসে ডিমে তাপ দিয়েছিল, তাদের বাবাকেও ঠিকমতো খুঁজতে যায়নি। অথচ, পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাদের অন্ধকার জগতে চলে যেতে হয়েছে। চোখ খুলে বাবা-মাকে দেখার আগেই চিরকালের জন্য চোখ বন্ধ হয়ে গেছে।

পাখি শিকার কিংবা ফসলে বিষ দেওয়ার আগে একবার ভাবুন, কী নির্দয়ের মতো কাজ করেন আপনারা! প্রকৃতিতে সবার বাঁচার অধিকার আছে, সবারই জীবন আছে। আপনাদের এমন আগ্রাসন ও লোভের আগুনে জ্বলে কেমন করে নিঃশেষ হয় কারো জীবন। আপনি কি সেই জীবনের করুণ কাহিনী জানেন? রাখেন সে হিসাব?

মন্তব্য