শেরপুরে সেন্টু শাইল ধানের উদ্ভাবক সেন্টু চন্দ্র হাজং

প্রজন্ম ডেস্ক

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত কৃষক সেন্টুচন্দ্র হাজং (৪৫) ধান চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। এখন তিনি ব্রিডিং ও শংকরায়ন পদ্ধতিতে নিজ হাতেই আবিষ্কার করছেন নতুন জাতের দেশি ধান। তার আবিষ্কার করা আমন জাতের বীজ ধান নিয়ে আবাদ করে আশপাশের কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। ইতোমধ্যেই তার উদ্ভাবিত সেন্টু শাইল চিকন জাতের ধান ফলন ভালো হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এবারের আমন মৌসুমে মাটির গুনাগুন ধরে রাখতে সম্পুর্ন জৈব পদ্ধতিতে তিনি ছয় একর জমিতে দেশি জাতের ধান আবাদ করেছেন। এছাড়াও দেশি জাতের ধান প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্ত হতে চলেছে এমন বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল, খাসিয়াবিন্নিসহ বেশ কয়েক রকমের ৪০০ প্লটে আমন জাতের ধান। বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাচাঁনোর জন্য নিজের এক একর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান ট্রায়াল করে লাগিয়ে রেখেছেন। নিজের ছয় একর জমিতে গোবর সার ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোষ্ট সার দিয়ে সেন্টু শাইল, চিনিশাইল, তুলসিমালা, পাইজাম, ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নি ধান লাগিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ধানও বেশ ভাল হয়েছে।

সেন্টু হাজং জানান, স্থানীয় কারিতাস নামের বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তিনি নিজেই শংকরায়ন ও ব্রিডিং পদ্ধতিতে নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করতে পারেন। এবার নিজের এক একর জমিতে ট্রায়ালও করেছেন। এখানে নাম ও নাম বিহীন আমন জাতের ১০০টি জাত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ব্রিডিং ও শংকরায়নের মাধ্যমে নতুন জাতের ধান আবিষ্কারের জন্য ২০ রকমের দেশি ধান লাগিয়েছেন। এ বছর তার আবিষ্কার করা নতুন জাতের ধানের নাম রখবেন বলে জানান। তার আবাদকৃত ধানের জমিতে তেমন বালাইনাশক ব্যবহার করেন না। তিনি আরো জানান, দেশি জাতের ধানে এমনিতেই পোকার আক্রমন কম হয়।

অন্যদিকে কেঁচো কম্পোষ্ট ও গোবর সার ব্যবহার করাতে ধানের গাছ শক্ত মজবুত হয়। ঝড় বৃষ্টি কিংবা উচু হলেও হেলে পড়েনা। একটু আধটু পোকার আক্রমন হলে নিমপাতা, গোলঞ্চপাতা ও বাসকপাতা পানিতে ভিজিয়ে ফুটিয়ে তারপর মেশিনের সাহায্যে জমিতে স্প্রে করেন। পাশাপাশি জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ধানের উৎপাদন খরচও কম পড়ে। এসব দেশি জাতের ধান মুটামুটিভাল হলে একরে ৪০ থেকে ৫০ মন হারে উৎপাদন হয়। একই গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেন ও আন্ধারুপাড়া গ্রামের কৃষক হাবিল উদ্দিন সেন্টুর কাছ থেকে শংকরায়ন করা সেন্টু শাইল জাতের ধান আবাদ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন। ওই গ্রামের অপর রত্নেশর বর্মণ জানান সেন্টু শাইল জাতের চিকন ধান দুই একর লাগিয়েছেন। এই জাতের ধানের বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়। তাছাড়া শুকনা ধান ৫০ মন হারে ফলন হয়। বাজারে চাহিদাও বেশ।

এক প্রশ্নের জবাবে সেন্টু বলেন, কৃষকরা রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে দিন দিন জমির উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলছে। নিজে কৃষকের সন্তান দাবি করে তিনি আরো জানান, এখনো তিনি হালের গরু দিয়ে ধান ক্ষেত চাষ করেন। এই ধান নিয়েই তার সব গবেষনা। ১৯৯১ সালে ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুতে পারেননি। প্রায় ৩০ বছর যাবত কৃষি কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। আর প্রায় ৮ বছর ধরে এই গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার গবেষনার কাজে সহায়তা করেন স্ত্রী অবলা রাণী হাজং। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে কৃষি বিজ্ঞানিরা যখন অল্প জমিতে অধিক উৎপাদন করতে তথা ফলন বাড়াতে নানা রকম গবেষনা চালিয়ে নতুন নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করছেন। আর তিনি সেই আগের হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হতে চলা ধান নিয়েই গবেষনা করছেন।

তিনি বলেন, দেশি জাতের ধানের আছে আলাদা বৈশিষ্ট এসব ধানের ভাত, পিঠাপুলি, মুড়ি বা এধরনের খাবার ক্ষেতে আলাদা স্বাদ। দেশি জাতের ধান যুগ যুগ ধরে কৃষকের কাছে থাকছে। তিনি চান দেশি জাতের ধানগুলো যেন কৃষকের মাঝ থেকে তাড়াতাড়ি বিলুপ্ত না হয়ে যায়। এজন্য কারিতাসের সহায়তায় তার এই উদ্যোগ। আর নতুন নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করতেও তার অলসতা নেই। বর্তমানে বেশ উৎসাহ নিয়ে কৃষিকাজ করছেন।

এ ব্যাপারে নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির বলেন, সেন্টু চন্দ্র হাজং প্রতি বছরই দেশি জাতের ধান ট্রায়াল করে আবাদ করেন। তার আবিস্কৃত দেশি জাতের ধান সেন্টু শাইল এর ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে। এই জাতের ধানে রোগ বালাই কম। এটি দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তা ভাবনা চলছে। দেশি জাতের ধান সংরক্ষণে তার উদ্যোগটি খুবই ভাল উদ্যোগ। তার উদ্যোগকে সফল করতে নালিতাবাড়ী কৃষিবিভাগ থেকে সেন্টু শাইল ধানের উদ্ভাবক সেন্টু চন্দ্র হাজংকে জাতীয়ভাবে পুরষ্কৃত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য