এক রাতে প্রতি মণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে হাজার টাকা

প্রজন্ম ডেস্ক

পেঁয়াজের রাজধানী খ্যাত পাবনার হাট বাজারে এক রাতের ব্যবধানেই যেন পেঁয়াজের অভাব দেখা দিয়েছে। দেশের অন্যতম বড় পেঁয়াজের হাট বনগ্রামে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩২শ থেকে ৩৩ শ টাকা দরে। অথচ একদিন আগেই এই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২শ টাকা দরে। ভারত পেঁয়াজ রফতানি করবে না বলে ঘোষণা দেয়ার এক খবরেই এক রাতে দাম বেড়ে গেছে বলে ব্যাপারীরা জানিয়েছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার প্রবীণ আড়ৎদার ও পেঁয়াজ চাষি ইব্রাহিম হোসেন জানান, পেঁয়াজের রাজধানী খ্যাত পাবনার সুজানগর ও সাঁথিয়ার হাটে মৌসুমের শেষ সময় বলে এমনিতেই পর্যাপ্ত পেঁয়াজ নেই। এর উপর গত মৌসুমে পেঁয়াজ ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে শিলা বৃষ্টির কবলে পড়ায় কৃষকের অনেক পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারেনি। এ কারণেই বাজারে একমাস আগে থেকে পেঁয়াজের দাম একটু একটু করে বৃদ্ধি পায়। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যে পেঁয়াজ বেচা হয়েছে ২২শ টাকা মণ দরে সেই পেঁয়াজ এক মাস আগে ছিল ১২শ টাকা মণ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আজাহার আলী জানান, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনা। গত বছর জেলার ৯ উপজেলায় পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধুমাত্র সুজানগর উপজেলাতেই উৎপাদন হয় প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। অবশ্য এ বছর প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত মৌসুমে পেঁয়াজ ঘরে তোলার সময় এবং ক্ষেতে থাকা অবস্থায় দু’দফা শিলা বৃষ্টির কবলে পড়ায় কৃষকের অনেক পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে না পারায় স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের আমদানি এমনিতেই কমে আসছিল। আর ভারত রফতানি করবে না জানানোয় হুট করে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ পেঁয়াজের হাট সাঁথিয়ার বনগ্রামে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজ না পেয়ে অনেক ব্যাপারীরা ফিরে যাচ্ছেন।

ব্যাপারী নজরুল ইসলাম জানান, বনগ্রাম হাটে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার ২০ থেকে ২৫ ট্রাক পেঁয়াজ বিক্রি হয় এবং তিনি নিজে ৩ ট্রাক করে পেঁয়াজ কিনে রাজধানীসহ অন্যান্য স্থানে নিয়ে যান। কিন্তু মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) যেন সব পাল্টে গেছে। অনেকেই আরও দাম বাড়ার আসায় পেঁয়াজ বাঁধাই করা শুরু করেছেন। আবার অনেক চাষি ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা শোনার পর হাটে পেঁয়াজ আনেননি। আরও দাম বাড়ার আশায় পেঁয়াজ আটকে দিয়েছেন। ফলে তিনি মাত্র কয়েক মণ পেঁয়াজ কিনতে পেরেছেন। অথচ গত হাটেও তিনি মাত্র ২১শ-২২শ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ কিনেছিলেন বলে জানান।

দেশের বৃহৎ পেঁয়াজ পল্লী সুজানগর এলাকার হাটবাজারেও একই চিত্র দেখা যায়। ব্যাপারী বিঞ্চুপদ সাহার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বাজারে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ নেই।

তিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে এও বলেন, অন্য দেশ থেকে আমদানি না করলে পেঁয়াজের দাম বাড়তেই থাকবে। আর আমদানি করতেও তো বেশ কয়েকদিন লেগে যায়। তবে মূলকাটা পেঁয়াজ ঠিকমতো উঠলে বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে তার ধারণা।

এদিকে মুড়ি পেঁয়াজ আবাদ নিয়ে সুখবর নেই পাবনার চাষিদের কাছে। টানা বৃষ্টির কারণে তারা মুড়ি পেঁয়াজ (মূলকাটা পেঁয়াজ বা কন্দ পেঁয়াজ) আবাদের জমিই প্রস্তুত করতে পারছেন না। যারা করেছিলেন তাদের ক্ষেতও টানা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে।

সুজানগরের গাজনা বিলপাড়ের বামনদি এলাকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছুদিন আগে বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠে তারা জমিতে মুড়ি বা মূলকাটা পেঁয়াজ রোপণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আবার অনেক কৃষকই মাঠের জমি প্রস্তুত করে পেঁয়াজ রোপণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন। এরই মধ্যে কয়েকদিন টানা বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

সুজানগরের আব্দুল বারেক নামে এক কৃষক বলেন, টানা এই বৃষ্টির ফলে মুড়ি পেঁয়াজের ক্ষেতইতো তৈরি করা যাচ্ছে না।

কৃষক আকবর হোসেন জানান, এ অঞ্চলের কৃষকেরা প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত নতুন মুড়ি (মূলকাটা) পেঁয়াজ জমিতে রোপণ করে থাকেন। কিন্তু অতি বৃষ্টির কারণে সঠিক সময়ে মুড়ি (মূলকাটা) পেঁয়াজ চাষ করা যাবে না।

সাধারণ কৃষকের ঘরে খুব বেশি পেঁয়াজ নেই বলে জানালেন সুজানগরের চরমানিকদিয়ার গ্রামের কৃষক শফিক প্রামাণিক। তিনি বলেন, তিনি প্রতি বছর মৌসুমি ও মূলকাটা মিলে ২০-৩০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেন। গত বছর উৎপাদিত অর্ধেক পেঁয়াজ পচে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি করে সব বেচে দিয়েছিলেন। এখন ঘরে আর কোনো পেঁয়াজ নেই। দাম বাড়লেও তার কোনো লাভ নেই।

আবার আরও দাম বাড়ার আশায় কিছু লোক নতুন করে পেঁয়াজ বাঁধাই করছেন। আতাইকুলা থানার কুমরগাড়ী গ্রামের আব্দুল বাতেন জানান, তিনি মঙ্গলবার বনগ্রাম হাট থেকে ৫০ মণ পেঁয়াজ কিনেছেন। তার ধারণা দাম আরও বাড়বে।

পাবনার খ্যাতিমান চাষি ও বাংলাদেশ ফার্মাস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহজাহান আলী বাদশা মঙ্গলবার সকালে মুঠোফোনে জানান, দাম বাড়ায় সব কৃষক লাভবান হচ্ছেন তা কিন্তু নয়। এখন যারা পেঁয়াজ হাটে আনছেন এর বেশিরভাগই মজুদদার। ৯০ শতাংশেরও বেশি চাষি পেঁয়াজ পচন, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি কারণে পেঁয়াজ বিক্রি করে ফেলেছেন। যারা বাঁধাই করে রেখেছিলেন তারা এখন পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। নতুন করে অনেকে আবার বাঁধাই শুরু করেছেন। সুতরাং দাম বাড়লেও চাষি লাভবান হচ্ছেন না।

পাবনা জেলা মার্কেটিং অফিসার হুমায়ুন কবীর জানান, পাবনা জেলায় এখনও প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ কৃষক বা ব্যবসায়ীদের ঘরে মজুদ আছে। দামটা বেড়েছে হুজুগে।

তিনি জানান, অন্য দেশ থেকে আমদানির সংবাদ এলেই কিন্তু আবার দাম কমে যাবে। সারা দেশের পেঁয়াজের দরটা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হয় খাতুনগঞ্জ কিম্বা কারওয়ান বাজার আড়ৎ থেকে। একটি জেলায় মনিটরিং করা গেলেও কিন্তু জেলা থেকে সারা দেশে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তারপরও তারা পেঁয়াজ বাজার মনিটরিং করা শুরু করবেন বলে জানান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর পাবনার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আজাহার আলী জানান, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধ পরিকর। অন্য দেশ থেকে আমদানি, টিসিবি থেকে বিক্রি শুরু আর মূলকাটা পেঁয়াজ পুরাপুরি বাজারে উঠলে দাম স্বাভাবিক হবে বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য