দেশ করোনায় ডুবলেও জেগে আছে মোদির মাহাত্ম্য

প্রজন্ম ডেস্ক

করোনাভাইরাসের কারণে মহাসংকটে রয়েছে ভারত। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে, মহামারি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যায় একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে রয়েছে তারা।

মহামারি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিশ্বের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় অনেক নেতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, কেউই বাঁচতে পারেননি সমালোচনার তির থেকে। অথচ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করোনা সংক্রমিত দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও এর বিন্দুমাত্র আঁচ লাগেনি নরেন্দ্র মোদির গায়ে।

গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। জয়ের পর দেশজুড়ে তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন নতুন গতি পায়।

দিল্লি-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক অসীম আলি বলেন, নরেন্দ্র মোদিকে ভারতে অনেকটা ‘জাতীয় মসিয়াহ’ হিসেবে দেখা হয়, যিনি ভারতীয় জাতি পুনর্গঠনের মহান এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন এবং সরকারের দিন-ভিত্তিক ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করা হয় না।

এ গবেষক বলেন, ভারতে মোদি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং মহাত্মা গান্ধীর ছাঁচে সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

গত কয়েক বছরে নরেন্দ্র মোদি নিজের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছেন। ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য (বর্তমান কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করেছেন; নাগরিকত্ব আইনে বিতর্কিত সংশোধনী এনেছেন, যাকে সমালোচকেরা মুসলিমবিরোধী বলছেন।

তবে ক্ষমতার দ্বিতীয় মেয়াদে তার প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বহুদূরে চলে গেছে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা ভারতে জনপ্রিয় এ নেতা কতদিন অস্পৃশ্য থাকতে পারেন তা পরিষ্কার নয়।

মূল ঘটনা
বিশ্বনেতাদের মধ্যে ট্রাম্প থেকে শুরু করে ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসোনারোসহ অনেকেই করোনা মহামারিকে হেলাফেলা করেছেন, ‘সামান্য ফ্লু’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। তবে এই ভুল করেননি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। মহামারির শুরুতেই তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন।

গত ২৪ মার্চ নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেন, তখন দেশটিতে মোট করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন মাত্র ৫০০ জনের মতো, মৃত্যুর ঘটনা ছিল ১০টি।

লকডাউন ঘোষণার সময় জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আপনারা দেখেছেন বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো কীভাবে মহামারির সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে। এসময় তিনি সতর্ক করেছিলেন, মহামারি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশটি কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে পারে।

গবেষক অসীম আলি বলেন, সেসময় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি দেখিয়েছিলেন, দেশের প্রয়োজনে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। সেখানে তাকে এমন সাধু হিসেবে দেখা হয়, যিনি সবসময় ভালো এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করেন।

যদিও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ভারত সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে একমত নন। ভাইরোলজিস্ট টি জ্যাকব জন দাবি করেছেন, ভারতে অনেক দ্রুত এবং বিস্তৃতভাবে লকডাউন জারি করা হয়েছিল, যখন দেশটিতে সংক্রমণ অনেক কম এবং কিছু অঞ্চলে পুঞ্জীভূত ছিল। এর ফলে এত বেশি লোক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিলেন, যতটা দরকার ছিল না। এছাড়া, বস্তির মতো এলাকাগুলোতে যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়, সেখানে সহায়তার জন্যেও পর্যাপ্ত রসদ ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে সেসময় দেশব্যাপী লকডাউন সংক্রমণ আটকাতে পারেনি, প্রাদুর্ভাব ছড়াতে কিছুটা বিলম্ব করেছে মাত্র।

দেশটির নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এখন পেছনে দেখলে বোঝা যায়, এটা (দেশব্যাপী দ্রুত লকডাউন) পরিষ্কার ভুল ছিল। আমাদের আরও অপেক্ষা করা উচিত ছিল। কারণ আমরা বৈশ্বিক মহামারি থামাতে পারিনি।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ একটি বিষয়ে একমত- ভারতে বিশ্বের অন্যতম কঠোর লকডাউন যথেষ্ট সময় ও পরিকল্পনা নিয়ে কার্যকর করা হয়নি।

ঘোষণার মাত্র চার ঘণ্টার মাথায় লকডাউন কার্যকর করা হয়েছিল সেখানে, যার ফলে দেশটি একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং চরম অভিবাসী সংকট সৃষ্টি হয়। শহুরে দিনমজুরেরা হঠাৎই বেকার হয়ে পড়েন। উপায়ন্তর না পেয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হন তারা। তবে বাস-ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পায়ে হেঁটেই রওয়ানা হন লাখ লাখ মানুষ।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার রামানন লক্ষ্মীনারায়ণ বলেন, কিছুদিনের আগাম নোটিশে লকডাউনের ক্ষতি হতো না; তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুতের পরিকল্পনা করতে পারতেন, মানুষজন এমন জায়গায় যেতে পারতেন যেখানে দীর্ঘদিন থাকার প্রস্তুতি নেয়া যেত, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উপায়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারত।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ থেকে বেঁচে যাওয়ার অর্থ কী যদি না খেয়েই মরতে হয় বা কাজ ছাড়াই আটকে থাকতে হয়?

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ভারতে অন্তত চার কোটি অভ্যন্তরীণ অভিবাসী লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে রাজ্য-বিশেষ লকডাউনে অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যুর পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে জানিয়েছে ভারতের শ্রম মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য