যশোর জেনারেল হাসপাতাল পরিনত হয়েছে অনিয়মের আখড়ায়

বিশেষ প্রতিবেদক

যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগসহ সকল শাখায় ব্যপক অনিয়মের মধ্য দিয়ে সাগর চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি হাসপাতালটিতে কর্মরত অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে একথা স্বীকার করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির তত্বাবধায়ক ডাক্তার দিলিপ কুমার রায় একথা অস্বীকার করে বলেন, এখানে কোন অনিয়মের সুযোগ নেই।

ক্যাশ কাউন্টার থেকে আসা টাকার হিসাব নিয়মিত ডিজি অফিসে পাঠানো হয়। প্রতিবছর এখানে অডিট করা হয়। সুত্রমতে, বৃহত্তর যশোর জেলাসহ আশপাশ থেকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিনই চিকিৎসা সেবা নিতে আসে প্রায় দেড় সহস্রাধীক রোগী।

এদের মধ্যে আউটডোরে অর্থপেডিক, সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি, ইএনটি, নিউরো, বক্ষব্যাধীসহ বিভিন্ন রোগে প্রতিদিন শতশত রোগী সংশ্লিষ্ঠ ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নেন এবং যেসব রোগীদের অবস্থা বেশী খারাপ তারা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে আগত প্রায় সকল রোগীদেরই চিকিৎসা সেবা নিতে সংশ্লিষ্ঠ ডাক্তারদের কাছে গেলে রোগ নির্ণয় করতে নানাবিধ পরিক্ষা নিরিক্ষা দেন।

পরিক্ষার রিপোর্ট আসার পরে ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দেন। সর্বনিম্ন ৩ শতাধীক রোগীর প্রতিদিন বিভিন্ন রোগের পরিক্ষা নিরিক্ষা করা হয় হাসপাতালটিতে। এদের মধ্যে অনেক রোগীর ১২/১৪ টি পরিক্ষাও কারানো লাগে। সেই অনুপাতে একজন রোগীর জদি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে টেষ্টের মূল্য সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা হয় তাহলে প্রতিদিন ৩ শতাধীক রোগীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা হারে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্যাশ হওয়ার কথা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হাসপাতালের ক্যাশিয়ারের কাছে প্রতিদিন জমা পড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। তাহলে মাসের ৩০ দিনের ভেতরে শুক্র এবং শনিবার প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ থাকে (গড়) ২০ দিন খোলা থাকে। দিনে ১লাখ ৩৮ হাজার টাকা কম জমা হলে একমাসে হয় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর এক বছরে ৩ কোটি ৩১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

হাসপাতালের প্রধান ক্যাশ কাউন্টারে দ্বায়িত্বরত নার্স মোত্তাকির খাতুন ও সৌরিন প্রজন্মের ভাবনাকে বলেন, গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১১ পর্যন্ত ৮৬ জন রোগীর পরিক্ষা নিরিক্ষার জন্য টাকা জমা নিয়েছি। এছাড়া রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের পরিক্ষা নিরিক্ষার টাকা আলাদা জমা নেওয়া হয় এবং টাকার রসিদ দেওয়া হয়। ঐ দুই নার্স বলেন, এখানে কতো টাকা জমা হয় এসব বলতে পারবো না। রিসিট দেখে ক্যাশের টাকা গুনে হিসাব মিলিয়ে ইনচার্জ নিয়ে যায়। সুপার স্যার যাকে যেখানে যে ডিউটি দেন আমরা সেই কাজ করি। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।

আপনাদের যা জানার দরকার সুপার স্যার এর কাছ থেকে জেনে নিবেন। জানতে চাইলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের ইনচার্জ মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রজন্মের ভাবনার বিশেষ প্রতিবেদক কে বলেন, পরিক্ষা নিরিক্ষা করতে আসা রোগীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। সিটি স্ক্যান (ব্রেইন) ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সিটি স্ক্যান (হোল এ্যাবডোমেন) ৬ হাজার ১শ টাকার ভেতরে। এক্সরে (ডিজিটাল) এর ক্ষেত্রে ২শ টাকা।

গতকাল পৌনে ১২টা পর্যন্ত পরিক্ষা নিরিক্ষার জন্য ৪১ জন রোগী পেয়েছি। প্রতিদিন এখানে কতো টাকা ক্যাশ হয় জানতে চাইলে তিনি কৌশলে প্রসংঙ্গটি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, এখানে যা ক্যাশ হয় ক্যাশিয়ার ইসরাফিল হোসেন এর কাছে জমা করা হয়। প্রয়োজন হলে সেখানে কথা বলেন। হাসপাতালের সুপার স্যার’র এভাবে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর আগে একাধীকবার মৃত্যুঞ্জয় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হাসপাতাল নিয়ে আপনাদের এতো মাথাব্যাথা কেন?

প্যাথলজি (রক্ত/মল-মূত্র) বিভাগের ইনচার্জ গোলাম মোস্তফা জানান, এখানে সিবিসি/পিবিএফ, এস.ক্রিয়েটিনাইন, ইএসআর/আরবিএস/২এইচএবিএফ, এসজিপিটি/এএলটি, এসজিওটি/এএসটি, এস.বিলিরুবিন, লিপিড প্রোফাইল, এস.ইউআরইএ, এস.ইউরিক এসিড, ইউরিন আর/এম/ই, এস.ইলেকট্রোলাইট, ইউডাল/এফ.এনটিজেন, এএসও টাইটার/ আরএ/ সিআরপি, এইচবিএসএজি/আরএ/ সিআরপি, এইচবিএসএজি/ এইচআইভি/ এইচসিভি সহ বিভিন্ন ধরণের পরিক্ষা নিরিক্ষা করা হয়।

গতকাল সকাল ৯টা থেকে বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত ৬৮ জন রোগী বিভিন্ন ধরণের পরিক্ষা নিরিক্ষার রিপোর্ট নেওয়ার জন্য সিরিয়ালে আছে। তবে খাতার তালিকায় ১০৭ জনের নাম দেখা গেছে। প্রশ্ন করা হলে গোলাম মোস্তফা বলেন, এখানে এক এক টেষ্টের এক এক মূল্য। অপর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ৬৮ জন আউটডোরের এবং ৩৯ জন ইনডোরের। ক্যাশের হিসাব ক্যাশিয়ার ইসরাফিল হোসেন দিতে পারবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ক্যাশিয়ার মোঃ ইসরাফিল হোসেন প্রজন্মের ভাবনাকে বলেন, চলতি মাসে ২ জানুয়ারী ক্যাশ কাউন্টার থেকে আমার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৬০ টাকা, ৩ জানুয়ারি ৮ হাজার ৮০০ টাকা, ৪ জানুয়ারি ১৩ হাজার ৯৬০ টাকা, ৫ জানুয়ারি ১৪ হাজার ৯৩০ টাকা, ৬ জানুয়ারি ১৪ হাজার ১৪০ টাকা। প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা বিভিন্ন ক্যাশ কাউন্টার থেকে আমার কাছে জমা দেওয়া হয়। আমি খাতায় জমা করে স্বাক্ষর দিয়ে টাকা বুঝে নি। এবং হাসপাতালের মুল ক্যাশে ঐ টাকা জমা করি। কোথায় কি আয় ব্যায় এটা কর্তৃপক্ষের বিষয়।

জানতে চাইলে হাসপাতালের আরএমও আরিফ আহমেদ প্রজন্মের ভাবনা কে বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালের সেবা এবং চিকিৎসার মান বেশী ভালো হওয়ায় বৃহত্তর যশোর জেলাসহ আশপাশের রোগিরা চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। প্রতিদিন গড় রোগীর সংখ্যা ১২ থেকে ১৫ শ। তিনি আরও বলেন, গতকাল শনিবারে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪১৫ জন। এর মধ্যে করোনা ওয়ার্ডের রেড জোনে ভর্তি ৩ জন, ইয়েলো জোনে নারি ৬ পুরুষ ৬। বাদবাকী করোনারি ইউনিটসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জানতে চাইলে সুপার ডাক্তার দিলিপ কুমার রায় বলেছেন, হাসপাতালে অনিয়ম এবং দূর্নিতির কোন সুযোগ নেই। প্রতিদিন ক্যাশ কাউন্টার থেকে যে টাকা আসে তা জমা করে হিসাব ডিজি অফিসে পাঠানো হয়। এবং প্রতিবছর অডিট করানো হয়। প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখানে সাগর চুরির প্রশ্নই ওঠে না। কোন বিভাগে কারও বিরুদ্ধে হিসাব, অনিয়ম এবং দূর্ণিতির কোন প্রকার অভিযোগ আসলে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে।

মন্তব্য