যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারকে সংশোধনাগারে পরিনত করতে চান জেলার তুহিন

কারাগার

পার্থ প্রতীম দেবনাথ রতি: পরিমানমত বাঁশ সাইজ করে ছেঁটে-ছুলে, রোদে শুকিয়ে, আগুনে তাতিয়ে তৈরি করি একটি শলা। পছন্দের রঙে রাঙিয়ে শলাটিকে কসমেটিকস মেডিসিন দিয়ে প্রসেস করে প্লাস্টিক ও পাটের দড়ি দিয়ে বুনার পরে তার দিয়ে শক্ত করে বেধে, সুঁই সুতো দিয়ে বুনে তৈরি করি একটি গোলাকার খাঁচা। খাঁচাটির নিচের অংশে টায়ার দিয়ে মুড়িয়ে তৈরি করি মোড়া,ছোট বড় চেয়ার-টেবিল,ঝাড়ু, চালি,ফুলদানী, কলমদানী, ছিকে, পাপসসহ হরেক রকমের জিনিস।

এভাবে বলছিলেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী কয়েদি আসামী রবিউল। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কিশোরবীলা গ্রামের মনোহর মোড়লের ছেলে রবিউল ইসলাম। প্রজন্মের ভাবনা কে গল্পের ছলে বেশ হাসিখুশি মনে তার এই বন্দী জীবনের অনুভূতিতে বলছিলেন, একটি হত্যা মামলায় ৩০বছর জেল হয় আমার। ২০০৪ সালে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয় আমাকে। ২১বছর কাটলো আমার জেল খাটতে খাটতে। এখানের মোড়া চালিতে বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরির কাজ শিখতে পেরেছি আবার ২৪জন কয়েদিকে শেখাতেও পেরেছি।

তাদেরকে শেখানোর ধারাবাহিকতা এখনও চলমান। কারাভোগ শেষে তারা বাইরের জীবনে ইচ্ছে করলে পেশাটিকে বেছে নিতে পারবে। পেশাটিকে ধরে রাখলে না খেয়ে মরতে হবে না। এসময় দীর্ঘ আনন্দের নিঃশ্বাস ছেড়ে রবিউল বলছিলেন, বছর খানিক পরে আমার মুক্তি মিলবে। কারা অভ্যন্তরে শেখা আসবাবপত্র তৈরির কাজ বাইরে গিয়েও পেশা হিসেবে আমি করতে পারবো। তাঁত চালিতে থাকা বন্দী কয়েদি আসামী সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার জেটুয়া গ্রামের খায়রুল ইসলামের ছেলে ডালিম শেখ একইভাবে তার কারা জিবনের কথায় বল্লেন, আমি তাঁত চালিতে কাজ করি।

এখানে মফিজুল ইসলাম আমার ওস্তাগার (প্রশিক্ষক) তার কাছ থেকে আমি তাঁতের সুতোয় রঙ করা থেকে শুরু করে গামছা, লুঙ্গি ও কয়েদি কাপড় তৈরির কাজ শিখেছি। তাঁতের সব পোষাকই আমি তৈরি করতে পারি। একটি হত্যা মামলায় ৩০বছর সাজা মাথায় নিয়ে প্রথম সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে যাই সেখানে ৫বছর কাটিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৯ বছর কারাভোগ করলাম (কারাগারে ৯মাসে বছর) হয়তো বছর দুয়েক পরে আমি মুক্তি পাবো। যে কাজ শিখেছি কারাঅভ্যন্তরে এই তাঁতের কাজ জদি পেশা হিসাবে করি তবে না খেয়ে থাকতে হবে না আমার।

কারাগারে থেকে ইলেকট্রনিক্স কাজ শিখেছেন বন্দী কয়েদি আসামী মশিউর রহমান। মেহেরপুর জেলার গাংনি উপজেলার যুগিন্দা গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে মশিউর রহমান বলেন, ৩০বছর সাজা নিয়ে জেলে ঢুকেছি। মেহেরপুর ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৯বছর কারাভোগ করলাম। কারাঅভ্যন্তরে ইলেকট্রনিক্সের সকল কাজ আমি করি। এই কাজগুলি শিখেছি আমি আমার ওস্তাগার মোহম্মদ হাসানের কাছ থেকে। আমার ঐ ওস্তাদ কারাভোগ শেষে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বর্তমানে কারাগারে এসকল কাজ আমিই করি। আমি অচিরেই হয়তো ছাড়া পাবো । কারাগারে শেখা ইলেকট্রনিক্স কাজ আমার অনেক কাজে লাগবে।

এটাকেই পেশা হিসাবে নিতে চাই আমি। এভাবে রবিউল ইসলাম, ডালিম শেখ ও মশিউর রহমানসহ অনেক বন্দী প্রজন্মের ভাবনার এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, আমাদের সকালে রুটি, ভাজি, সুজি আবার কোনদিন খিচুড়ি দেওয়া হয় সকালের নাস্তায়, দুপুরে ভাত ভাজি ডাল, রাতে ভাত সবজি, ডাল, মাছ মাংশ (এক একদিন এক একরকম) খেতে দেওয়া হয়। আর ইচ্ছেমতো খাবার খেতে চাইলে ভেতরে থাকা ক্যান্টিনে টাকা দিলেই তা খেতে পারি। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে আমাদের কারাজীবন। আগে সপ্তাহে এক-দুইদিন পরিবারের লোকজন এসে দেখা করে যেতেন।

করোনার কারনে এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জেলার তুহিন কান্তি খান স্যার দয়া করে প্রতি সপ্তাহেই পরিবারের সাথে মোবাইলে কথা বলিয়ে দেন। জেলার স্যার খুবই আন্তরিক মানুষ। মাঝে মাঝে আমাদের কাছে এসে হেসে হেসে কথা বলেন। অনেক সময় আমাদের সুখ দুখের কথাগুলোও মনযোগ সহকারে শোনেন। আমরা যাতে হাতের কাজ শিখে সাবলম্বি হতে পারি সেজন্য তিনি সবসময় চেষ্টা করেন।

জানতে চাইলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার তুহিন কান্তি খান প্রজন্মের ভাবনাকে বলেন, যশোর কারাগারে বন্দী ধারন ক্ষমতা ১৯১৯জন। বর্তমানে বন্দী কয়েদি ও হাজতি আসামীর সংখ্যা ১৪২১জন। এরমধ্যে পুরুষ ১৩৫৭জন ১৪জন নারি। পুরুষ হাজতি ৭৮২জন নারি হাজতি ৩৪জন। পুরুষ কয়েদি ৪৪৭জন নারি কয়েদি ২৫জন। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীর সংখ্যা পুরুষ ১০০জন নারি ৫জন এছাড়া ২৮জন আরপি (মুক্তিপ্রাপ্ত) বিদেশী বন্দী রয়েছে। আইনি জটিলতার কারনে তারা মুক্তি পাচ্ছে না। এ সময় জেলার বলেন, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দর্জীচালি, কামার, মোড়া, তাঁত, মিস্ত্রি, বাবুচালি,ঝাড়ু, রাস্তা মেরামত,মালি, বাগানসহ অসংখ্যা চালি আছে।

বন্দীরা চাইলেই এখানে ঐসব চালি থেকে হাতের কাজ শিখতে পারেন। কারাভোগ শেষে অনেকেই বাইরের স্বাভাবিক জীবনে ঐসমস্ত কাজ বেছে নিয়েছে। আমি জদি এদের কিছু শেখাতে পারি তাতেই আমার প্রাপ্তি। আমি ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান এনে কারাগারে থাকা বন্দীদেরকে শীতবস্ত্র প্রদান করেছি। তিনি আরও বলেন, যারা অচ্ছল তাদের প্রতি আমার দরদবোধ বেশী। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারকে আমি সংশোধনাগারে পরিনত করতে চাই।

মন্তব্য