জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে খেজুর গাছঃ খেঁজুর রসের সংকট

আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ

আবহমানকাল থেকেই দেশবাসী পরিচিত “যশোরের যশ, খেজুরের রস” প্রবচনটির সাথে। শীতের শুরুতে খেজুরের রস, গুড় আর পাটালির জন্যে দেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে থাকে। শীত মানেই তীব্রতা, শীত মানেই উৎসবের আমেজ। শীতের শুষ্কতা ও তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে যেমন নেয়া হয় সুরক্ষামূলক প্রস্তুতি, তেমনি পিঠা-পায়েস উৎসবের মাধ্যমে শীতকে বরণ করে নেয় আবহমান গ্রাম, বাংলার মানুষ। পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল হলেও আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে প্রকৃতিতে শীতের হাওয়া বইতে শুরু করে। আর পুরা শীত মৌসুম জুড়েই প্রতিটি বাড়ীতে চলে খেঁজুর রসের পিঠা পায়েসের উৎসব।

আর শহরে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সমাগম ঘটে গ্রামের বাড়িতে শীতের পিঠা-পায়েস খাওয়ার জন্য। তবে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারনে খেঁজুর রসের সংকট এখন অনেক। শীতের তীব্রতা শুরু হলেও খেঁজুর রসের সংকট রয়েই গেলো। প্রতিদিন সকালে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও এক ভাঁড় রস মিলছে না। মূলত টালি কারখানার জ্বালানি হিসাবে অবাধে খেঁজুর গাছ নিধনের ফলে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে সচেতন মহলের অভিমত। যশোরের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় সহস্রাধীক টালি কারখানা রয়েছে। সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের খেয়াল কম থাকার কারনে ওই সব কারখানাতে অবাধে খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একসময় যশোরের সব উপজেলায় ছিল অসংখ্য খেঁজুর গাছ। শীত আসলেই প্রতিটি বাড়ীতে ধুম পড়ে যেত পিঠা-পায়েস উৎসবের। রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো অনেক পরিবার। লবন পানির বিরুপ প্রভাব, ইট ভাটা ও টালী কারখানায় জ্বালানি হিসাবে অবাধে খেজুর গাছ ব্যবহার করার ফলে গত কয়েকবছরের ব্যবধানে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এ গাছের সংখ্যা। ফলে গত কয়েকবছর ধরে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে খেঁজুর রসের। এদিকে গাছের সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমে যাওয়ার সাথে সাথে কমে গেছে গাছির সংখ্যা। গাছ কাটার পেশায় এখন আর তেমন লাভজনক না হওয়ায় অনেকেই এ পেশা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।

আবার অনেকেই পুরোনো এ পেশা ধরে রাখার প্রাণপন চেষ্ঠা করে যাচ্ছে। শীতের তীব্রতা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই  গাছ কাটা, রস নামানো, বিক্রয় ও গুড় তৈরীর মধ্য দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন খেঁজুর গাছিরা। এদিকে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও মৌসুমের শুরুতেই চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনীয় রস মিলছে না বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। কেশবপুর উপজেলার পৌর শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোকলেছুর রহমান মুকুল জানান, প্রতিদিন সকালে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে এক হাঁড়ি রস মিলানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন যে পরিমান রস সংগ্রহ করা হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে মধ্যকুল গ্রামের গাছি তাছের গাজী জানান।

ইট ভাটা ও টালী কারখানায় জ্বালানি হিসাবে অবাধে খেঁজুর গাছ ব্যবহার করার ফলে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে নাগরিক সমাজের আহবায়ক এ্যাডভোকেট আবু বক্কার সিদ্দিকী জানান। খেঁজুর গাছ সংরক্ষনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন না করলে আগামীতে এ অঞ্চল থেকে খেঁজুর গাছের বিলুপ্তি ঘটতে পারে বলে তিনি আশংকা করে বলেন এক্ষেত্রে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র থেকে জানা যায়, যশোরের আট উপজেলায় প্রায় সাত লাখ ৯১ হাজার ৫১৪ টি খেজুরগাছ আছে।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি যশোর সদর, মণিরামপুর, শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলায়। গতবছরও জেলায় চার হাজার ৬৪ মেট্রিক টন গুড়-পাটালি ও প্রায় দুই হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন রস উৎপাদন হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব গুড়-পাটালি দেশের অন্যান্য জেলায়ও গেছে। তবে জেলায় আগের মত খেজুর গাছ নেই, একইসাথে গাছির সংখ্যাও কমছে। অভিজ্ঞ গাছি ছাড়া রস সংগ্রহ করা যায় না। গাছিদের পরবর্তী প্রজন্ম খুব বেশি এই পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। দিনদিন গাছের সংকটের কারনে রসের ও সংকট দেখা দিচ্ছে।

মন্তব্য