‘ইতি, তোমারই ভ্যালেন্টাইন’

পার্থ প্রতীম দেবনাথ রতি

‘তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার, জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার, চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার, কত রূপ ধরে পরেছ গলায় নিয়েছ সে উপহার, জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।’ বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর এ আবেগমথিত অনুভূতি আজ পৃথিবীর কোটি কেটি মানুষের মনে। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, নানা বয়সের মানুষই ভালোবাসার এই দিনে একসঙ্গে সময় কাটাবেন। প্রিয় মানুষকে ভালোবাসতে কোন বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। তবে এই দিনটি পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হলেও আজকের দিনে বাঙালি মনের ভালোবাসাও যেন পায় নতুন রূপ।
বসন্ত বাতাসে হৃদয়ের মিথস্ক্রিয়ায় পহেলা ফাল্গুনের রেশ কাটতে না কাটতেই আজ আরেক রঙের স্রোত। হৃদয়ের দশদিগন্তে আজ আলোর নাচন। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস (ভ্যালেনটাইনস ডে) আজ। ওপ্রান্ত থেকে হয়তো কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। হয়তো সে চুপ করে থাকবে। হয়তো সব জড়তা ভেঙে বলতেও পারে, ‘আমিও তোমায় ভালোবাসি’।
বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাসে আজ হারিয়ে যাবে প্রেমিকযুগল। সব আবেগ আর অনুভূতি দিয়ে প্রিয় মানুষটিকে বুঝিয়ে দেবে ভালোবাসার গভীরতা। মানব-মানবীর চিরকালের যে প্রেম তার জয়গান হবে চারদিকে। আজকের এই রাঙা সকাল, বিকাল বা সন্ধ্যাটা একসঙ্গে কাটিয়ে প্রেমিকযুগল গাইবে ভালোবাসার গান। অনেকের জন্য যেমন আজকের কোনো একটা সময় হবে ভালোবাসার প্রথম প্রহর, তেমনিভাবে অনেকে উদযাপন করবেন একসঙ্গে পথচলার কয়েক বছর। কেউবা হয়তোবা আজ তার হারানো প্রিয়জনকে মনে করে মনে মনেই বলবে ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে, হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে’।
আজকের দিনে সবকিছুতেই প্রাধান্য পাবে ভালোবাসার মানুষটির পছন্দ। তাই প্রিয় মানুষটি প্রিয় রং বা প্রিয় পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে উপস্থিত হবেন আরেকবার। তবে ভালোবাসার রং লাল বলে বেশির ভাগ যুগলই নিজেদের সাজাবেন লালে লালে। নতুন করে একে অপরের প্রেমে পড়বেন। নিজেদের মতো করে কাটিয়ে দেবেন হয়তো সারাটি দিন।
ভালোবাসা দিবসটি মূলত প্রেমিক-প্রেমিকার চিরায়ত প্রেমকেই বোঝানো হয়। আমাদের দেশে এখন দিবসটি ঘটা করে পালন করা হলেও এটি এসেছে পশ্চিমা দেশের সংস্কৃতি থেকে।
ভালোবাসা দিবস উদযাপনের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এ নিয়ে একাধিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এই ভালোবাসা দিবসের পেছনের যে গল্প, তা এক আত্মদানের গল্প। ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় ভ্যালেন্টাইন মনে মনে ভালোবেসে ফেলেন কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে। এর কিছুদিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি সম্রাটের নির্দেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কথিত আছে, ওই দিনই প্রথম তিনি মেয়েটিকে এক চিঠিতে জানান তাঁর ভালোবাসার কথা। চিঠির নিচে লেখেন, ‘ইতি, তোমারই ভ্যালেন্টাইন’।
ভ্যালেনটাইনস ডে সার্বজনীন হয়ে ওঠে আরও পরে প্রায় ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে রয়েছে আরও একটি কারণ। সেন্ট ভ্যালেনটাইনের মৃত্যুর আগে প্রতি বছর রোমানরা ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করত ‘জুনো’ উৎসব। রোমান পুরানের বিয়ে ও সন্তানের দেবী জুনোর নামানুসারে এর নামকরণ। এ দিন অবিবাহিত তরুণরা কাগজে নাম লিখে লটারির মাধ্যমে তার নাচের সঙ্গীকে বেছে নিত। ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমানরা যখন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীতে পরিণত হয় তখন ‘জুনো’ উৎসব আর সেন্ট ভ্যালেনটাইনের আত্মত্যাগের দিনটিকে একই সূত্রে গেঁথে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভ্যালেনটাইনস ডে’ হিসেবে উদযাপন শুরু হয়। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে রোমের রাজা পপ জেলুসিয়াস এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। কালক্রমে এটি সমগ্র ইউরোপ এবং ইউরোপ থেকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

One thought on “‘ইতি, তোমারই ভ্যালেন্টাইন’

মন্তব্য