যে আফসোসে পুড়ছেন এটিএমের সন্তানরা!

প্রজন্ম রিপোর্ট

এটিএম শামসুজ্জামান। একটি নামই শুধু নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটি দুর্দান্ত ইতিহাস। একাধারে তিনি একজন অভিনেতা, পরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার ও গল্পকার। শুরুতে মঞ্চে কাজ করতেন অভিনেতা হিসেবেই। এছাড়া চলচ্চিত্র জীবন শুরু করেন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। এরপর আসেন খল অভিনয়ে। অসংখ্য চলচ্চিত্রে এটিএম শামসুজ্জামানের খল চরিত্রগুলো আজও জীবন্ত।

বরেণ্য অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের ৫ সন্তানের বিশাল পরিবারের সবচেয়ে প্রাণবিন্দুতে ছিলেন। সঙ্গে ছিল নাতি-নাতনিরাও। আর তিনি এলাকার মানুষদের কাছেও ছিলেন চোখেরমণি। সকাল সাড়ে ৯টায় সূত্রাপুর মসজিদে যখন মাইকে ঘোষণা করা হলো, প্রিয় অভিনেতা আর নেই- চারদিকটা হয়ে গেল থমথমে। হাসিমুখে যে মানুষটা সেলফি, কৌতুকসহ নানা কিছুর আবদার পূরণ করে যেতেন, সেই মানুষটাই নেই! পরিবারের সদস্যরাও শেষ দিকে এটিএমের সব ইচ্ছেগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করতেন। তবে একটি আক্ষেপের কথা জানালেন তার মেয়ে কোয়েল আহমেদ।

তিনি বললেন, ‘‘উনি একটি ছবি বানাবেন- এটা আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছাতে পারিনি। বাবার একটাই কথা ছিল, আমার বিষয়ে কারও কাছে কিছু বলবা না। চাইবা না। আমারে ছোট করব না। প্রধানমন্ত্রী যখন ১০ লাখ টাকা আমার বাবাকে দিলেন, অনেকেই বললেন, ‘মাত্র এই ক’টাকা দিয়েছেন উনাকে’। বাবা পাল্টা জবাব দিয়েছেন, ‘এটা কি আমার বাবার টাকা? নাকি আমি রোজগার করে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে দিতাম। তিনি টাকা দিয়েছেন, এটাই সম্মান। এটাই আমার জন্য অনেক বেশি’। আমার বাবা সর্বশেষ উনার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন।’’

কোয়েল আহমেদ জানান, সন্তান হিসেবে একটি আফসোস তাদের পুড়িয়ে যাচ্ছে। কোয়েলের ভাষ্য, ‘বাবার সব ইচ্ছে আমরা সাধ্যমতো পূরণ করার চেষ্টা করেছি। শুধু একটি ইচ্ছে আপনারা (সাংবাদিক) প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেননি। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবেন। কিন্তু সেটা তিনি করতে পারলেন না। বাবার জীবনে এই একটাই আফসোস থেকে গেল। প্রধানমন্ত্রী জানতে পারলেন না- তার ইচ্ছের কথা। এখন বাবা নেই, আর কোনও ইচ্ছে নেই।’

এটিএম শামসুজ্জামানের ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুর জেলার ভোলাকোটের বড় বাড়ি আর ঢাকায় থাকতেন দেবেন্দ্রনাথ দাস লেনে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল, রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে। পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিল আরেক অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে। তারপর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। তার পিতা নূরুজ্জামান ছিলেন নামকরা উকিল এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। মাতা নুরুন্নেসা বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শামসুজ্জামান ছিলেন সবার বড়।

হাসির ছলে কূটচালে মানুষের ক্ষতি করতে সিনেমার পর্দায় এটিএমের জুড়ি মেলা ভার। তার চরিত্রগুলো চিত্রনাট্যে সেভাবেই লেখা হতো। দীর্ঘ একটা সময় তিনি খল চরিত্রে সিনেমার নির্মাতাদের কাছে সেরা ভরসা হিসেবে ছিলেন। এরপর তিনি ঝুঁকে পড়েন কৌতুক প্রধান চরিত্রের অভিনয়ে। বেশরিভাগ সময়ই তাকে দেখা যেতে লাগলো হাস্যরসের সংলাপে। ধীরে ধীরে তিনি কমেডি চরিত্রে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে গেলেন। সিনেমার পাশাপাশি টিভি নাটক ও টেলিফিল্মেও এটিএম শামসুজ্জামান নতুন করে সারা দেশের মানুষকে বিনোদিত করতে শুরু করেন। চলচ্চিত্র ‘টক জাল মিষ্টি’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘জামাই শ্বশুর’, ‘মোল্লাবাড়ির বউ’, নাটক ‘পত্র মিতালী’সহ অনেক কাজ তার উদাহরণ হয়ে আছে।

১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে। প্রথম কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের জন্য। ছবির পরিচালক ছিলেন নারায়ণ ঘোষ মিতা, এ ছবির মাধ্যমেই অভিনেতা ফারুকের চলচ্চিত্রে অভিষেক। এ পর্যন্ত শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনী লিখেছেন।

অভিনেতা হিসেবে চলচ্চিত্র পর্দায় আগমন ১৯৬৫ সালের দিকে। ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনা আসেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দায়ী কে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। তিনি রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘চোরাবালি’তে অভিনয় করেন ও শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধূরির ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, সুভাষ দত্তদের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ২০০৯ সালে প্রথম পরিচালনা করেন শাবনূর-রিয়াজ জুটিকে নিয়ে ‘এবাদত’ নামের একটি ছবি।

অভিনয়-নির্মাতার পাশাপাশি একজন লেখক হিসেবেও এটিএম শামসুজ্জামানও নন্দিত। কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান গল্প, কবিতা লেখারও চর্চা করেছেন নিভৃতে।

অভিনয় জীবনের শুরুতে ষাটের দশকে টিভি নাটকে অংশগ্রহণ ছিল তার। তার উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকসমূহ হলো- রঙের মানুষ, ভবের হাট, ঘর কুটুম, বউ চুরি, নোয়াশাল, শতবর্ষে দাদাজান

এছাড়া তার উল্লেখ যোগ্য সিনেমাগুলো হচ্ছে-মলুয়া, বড় বউ, অবুঝ মন, ওরা ১১ জন, শ্লোগান, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, সংগ্রাম, ভুল যখন ভাঙ্গলো, চোখের জলে, লাঠিয়াল, অভাগী, নয়নমনি, যাদুর বাঁশি, গোলাপী এখন ট্রেনে, অশিক্ষিত, সূর্য দীঘল বাড়ী, ছুটির ঘণ্টা, লাল কাজল, পুরস্কার, প্রিন্সেস টিনা খান, রামের সুমতি, ঢাকা ৮৬, দায়ী কে?, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত, দোলনা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, অজান্তে, স্বপ্নের নায়ক, তোমার জন্য পাগল, ম্যাডাম ফুলি, চুড়িওয়ালা, শ্বশুরবাড়ী জিন্দাবাদ, জামাই শ্বশুর, আধিয়ার, শাস্তি, মোল্লা বাড়ির বউ, হাজার বছর ধরে, আমার স্বপ্ন তুমি, দাদীমা, আয়না, ডাক্তার বাড়ী, চাঁদের মতো বউ, মন বসেনা পড়ার টেবিলে, এবাদাত, বিশ্বাসসহ অসংখ্য ছবি।

শনিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে এটিএম শামসুজ্জামান সমাহিত করা হয়েছে। ইচ্ছে অনুযায়ী রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বড় ছেলের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এই বরেণ্য অভিনেতাকে।

মন্তব্য