খাদ্য চেয়ে ১শ প্যাকেট জরিমানা, পুরো টাকাই পাচ্ছেন ফরিদ

প্রজন্ম রিপোর্ট

বাবার রেখে যাওয়া ভবনের তিনতলার এক পাশের ছাদে টিনশেডের দুটি ছোট কামরায় একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন ফরিদ উদ্দিন (৫৭)। একটি হোসিয়ারি দোকানে চাকরি করে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে কোনো মতে চলে তার সংসার।মাস তিনেক আগে ব্রেইনস্ট্রোক করে বাম চোখের দৃষ্টি হারানোর পাশাপাশি কথাবার্তাও খুব একটা গুছিয়ে বলতে পারেন না তিনি। কখনও কখনও দুপুরেই ভুলে যান সকালে কি বলেছেন।

পরিবার ও প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য তাই সরকারি ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে খাদ্য চান তিনি। আর এতেই খড়গ নামে তার ওপর। দুই বাড়ি দূরে থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী উপজেলা পরিষদ থেকে তদন্তে আসা লোকদের বলে দিয়েছেন ফরিদ উদ্দিন একজন ব্যবসায়ী এবং চারতলা বাড়ির মালিক।

এই তথ্য পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাজির হয়ে ১শ দরিদ্রকে ত্রাণ দিতে বলেছিলেন ফরিদ উদ্দিনকে। এই ত্রাণের টাকা যোগাড় করতে নিজের আর ভাইয়ের স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বন্ধক দিতে হয়েছে তাকে। কষ্টে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছেন তিনি।

রোববার (২৩ মে) নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের দেওভোগ নাগবাড়ী এলাকায় ঘটা এ ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ১শ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী কিনতে যত টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকা তাকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ বাংলানিউজকে জানান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শামীম ব্যাপারীকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বুধবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ফরিদের খরচ হওয়া প্রায় ৭৫ হাজার টাকা তাকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফরিদ উদ্দিন ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে খাদ্যসামগ্রী চাওয়ার ছলে দুষ্টুমি করেছেন বলে যে সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, বাস্তব চিত্র তার পুরোপুরি উল্টো।

বৃহস্পতিবার (২০ মে) ইউএনওর নির্দেশ মতে ১শ দরিদ্রকে খাদ্য সহায়তা দিতে ফরিদ উদ্দিন রাজি হওয়ায় শনিবার বিকেলে সেই ত্রাণ দিতে এসেছিলেন ইউএনও আরিফা জহুরাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরাও। কিন্তু অসুস্থ ফরিদ উদ্দিন, তার স্ত্রী আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ছেলেকে দেখে তারাও ‘হকচকিয়ে’ যান। আশ্বাস দিয়ে যান, বিষয়টি তারা খুব ভালোভাবেই দেখবেন এবং ফরিদ উদ্দিনের ব্যাপারে ভ্রান্ত তথ্য দেওয়া স্থানীয় ইউপি সদস্যের ব্যাপারেও প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেবেন।

শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ফরিদ উদ্দিনের বাড়ির সামনের রাস্তায় শত শত মানুষ ভিড় করেছেন। কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর নেতৃত্বে তার লোকজন ত্রাণ নিতে আসা মানুষদের লাইনে দাঁড় করানোর কাজে ব্যস্ত। ইউএনওর আসার কথা আছে বলে সেখানে চেয়ার টেবিলও সাজিয়ে রেখেছেন আইয়ুব আলী। অবস্থা দেখে মনে হবে ত্রাণ সহায়তা তিনিই দিচ্ছেন। কিন্তু ওই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।

সেই কথিত চারতলা বাড়ির মালিক ফরিদ উদ্দিন, তার স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী এক কিশোরকে নিয়ে অসহায়ের মত এক কোণে কাদঁছেন। কথা বলতে গেলে ভয়ে কিছুই বলছিলেন না। এরপর ফরিদ উদ্দিনের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মূল বিষয়টি বলার পর মুখ খুললেন তারা।

ফরিদ উদ্দিন ও তার স্ত্রী জানান, প্রকৃতপক্ষে প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য সরকারের তরফ থেকে অনেক খাদ্য পাওয়ার আশাতেই ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়েছিলেন ফরিদ উদ্দিন। ফোন করার দুইদিন পর সেখান থেকে তাদের ঠিকানা জানা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ইউএনও আরিফা জহুরাসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

ফরিদ উদ্দিন বলেন, ইউএনও আমাকে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে আমি সত্যটাই বলেছি যে বাড়ির মালিক আমি। তিনি আমাকে বলেছেন, আপনি বৃদ্ধ মানুষ তাই জেল-জরিমানা করলাম না। কিন্তু যেহেতু আপনি সচ্ছল হয়ে খাবার চেয়েছেন তাই ১শ দরিদ্রকে ত্রাণ দিতে হবে। আমি ভয়ে রাজি হই। কিন্তু সে সময় আমার অবস্থাটা বলতে গেলেও আমাকে স্থানীয় মেম্বার আইয়ুব আলী বলার সুযোগই দেননি। উল্টো ৩৩৩ নম্বরে ফোন না করে উনাকে কেন জানালাম না সেজন্য ধমকাতে থাকেন। এসব কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন ফরিদ উদ্দিন আর তার স্ত্রী। এ সময় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার প্রতিবন্ধী ছেলেটি।

ফরিদের স্ত্রী বলেন, বাড়িটির মালিক আমার স্বামীর ছয় ভাই ও এক বোন। বাড়িটি পুরোপুরি চারতলাও না, তিনতলার এক পাশে টিনশেড আর আমরা অপর পাশের ছাদে দুটি টিনশেডে ছোট রুম করে থাকি। তিন মাস আগে আমার স্বামী (ফরিদ) স্ট্রোক করে তার বাম পাশের চোখটির দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি কথাবার্তাও ঠিকমত বলতে পারেন না, অনেক কিছু মনে রাখতে পারেন না। যে দোকানে কাজ করতেন দয়া করে সেই দোকানের মালিক তাকে এখনও চাকরিতে রেখেছেন।

এই ত্রাণ যোগাড় করতে গিয়ে আমাদের স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখতে হয়েছে, ধার করতে হয়েছে। মেম্বার আইয়ুব আলীও আমাদের সুদে ১০ হাজার টাকা ধার দিয়েছেন। গত দুইদিন আমরা ইউএনও আপার কাছে যেতে চাইলেও মেম্বার আমাদের ভয় দেখিয়েছেন যে ত্রাণ দেওয়ার আদেশ না মানলে তিন মাসের জেল হয়ে যাবে।

এদিকে ফরিদ উদ্দিনের সেই ছোট দুই কামরায় গিয়ে দেখা গেল, দুটি ভাঙাচোরা খাট আর পুরনো কয়েকটি আসবাবপত্র ছাড়া কিছুই নেই।

এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, ফরিদ উদ্দিন একজন হোসিয়ারি ব্যবসায়ী, চারতলা বাড়ির মালিক। তিনি কেন ৩৩৩ নম্বরে ফোন দেবে? আর খাবারের দরকার হলে আমাকে বলতো, আমি স্থানীয় মেম্বার। এটাতো আমার জন্য ‘ডিসক্রেডিট’।

মাত্র দুই বাড়ি পরে থেকেও ফরিদ উদ্দিন প্রতিবন্ধী ছেলে নিয়ে কষ্টে আছেন এমনটি জানলেন না কেন? এমন প্রশ্ন করার পর নিজের বক্তব্য তাৎক্ষণিক ঘুরিয়ে ফেলেন আইয়ুব আলী।

তিনি বলতে শুরু করেন, আমি ইউএনও ম্যাডামকে বলেছিলাম ১০ লোককে ত্রাণ দেওয়ার অবস্থা ফরিদের নেই। কিন্তু ততক্ষণে কিছুই করার ছিল না।

মন্তব্য