যশোরে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনা

প্রজন্ম রিপোর্ট

যশোরের হু হু করে বাড়ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও প্রতিদিন জেলায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণের হার। জেলায় গড় করোনা শনাক্তের হার ৪৮.৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ইতোমধ্যে জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন চারজন। এই সময়ে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৪৭ জন।

করোনার প্রথম ধাপে চিহ্নিত করা হটস্পটগুলোতে দ্বিতীয় ধাপেও আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হচ্ছে। বর্তমানে শহর থেকে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার প্রথম দিকে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল শহর এলাকাতে। কিন্তু এখন করোনার সংক্রমণ গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে যশোর জেলায় যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশিরভাগেরই বাড়ি গ্রামে।

এ পর্যন্ত যশোরে করোনায় ১০১ মারা গেছেন। এরমধ্যে যশোর সদরে ৬৮, অভয়নগরে ১০, বাঘারপাড়ায় তিনজন, চৌগাছায় চারজন, ঝিকরগাছায় তিনজন, কেশবপুরে ছয়জন ও শার্শায় সাতজন। এরমধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগেরই বাড়ি গ্রামে।

সম্প্রতি মারা যাওয়া কয়েকজন হলেন-যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকার লিয়াকত আলী (৪৫), একই এলাকার মাসুদ রানার মেয়ে সুমি খাতুন (১৪), এনায়েতপুর গ্রামের জিয়াউর রহমান জিয়া (৪০), নওদাগ্রামের সাহেব আলীর স্ত্রী বিউটি খাতুন (৩৫), যশোরের শার্শা উপজেলার মাটিপুকুর গ্রামের সাগর বিশ্বাসের ছেলে আলমগীর হোসেন (৩৬), রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত আজগর আলীর ছেলে রফি উদ্দিন (৭০), ধান্যতাড়া গ্রামের মৃত ইমাম আলীর ছেলে আতিয়ার রহমান (৭৫) ও কাশিয়ানী গ্রামের মতিয়ার রহমানের স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৪০), চৌগাছা উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের বড় খানপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিন উদ্দিন (৬৫), নারায়ণপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৪৮), বড় খানপুর গ্রামের বাসিন্দা আমিন উদ্দিন (৬৫), মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ উপজেলার ফজলুর রহমানের ছেলে শাহবুদ্দিন (৬৫), ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ এলাকার হাবীবুর রহমানের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা বেগম (৫৫), বাঘারপাড়া উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের জয়নুদ্দিনের ছেলে ও জহুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কামরুজ্জামান তুহিন (৪৫)। এসব গ্রামে আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি হচ্ছে।

সিভিল সার্জন অফিসের একটি সূত্র জানায়, করোনার প্রথম ধাপে যেসব এলাকা ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছিল, করোনার দ্বিতীয় ধাপেও সেসব এলাকায় আক্রান্ত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

যশোর সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, ১৮ জুন পর্যন্ত যশোর জেলায় ৯ হাজার ২৪১ জন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১০১ জন নারী-পুরুষ। সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪০ জন। এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৮৪ জন। হোম এবং হাসপাতাল আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন দুই হাজার ৩১৬ জন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষণ দলের সদস্য অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর জাহিদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যবিপ্রবির জেনোম সেন্টারে নমুনা পরীক্ষায় ২৭২ জনের কোভিড-১৯ পজিটিভ ফলাফল এসেছে। এরমধ্যে যশোরের ৫৩৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৪৭ জনের, মাগুরার ৩৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১০ জনের ও নড়াইলের ৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৫ জনের করোনা পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ যবিপ্রবির ল্যাবে মোট ৬৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৭২ জনের করোনা পজিটিভ এবং ৩৭৮ জনের নেগেটিভ ফলাফল এসেছে।

যবিপ্রবি ছাড়াও যশোরে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, যশোর আড়াইশ’ শয্যা হাসপাতালে অ্যান্টিজেন ও জিন এক্সপার্ট পরীক্ষার পর আরও ৪৪ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে যশোর সদর উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২১৪, অভয়নগরে ১৭ জন, চৌগাছায় আটজন, ঝিকরগাছায় ২৬ জন, কেশবপুরে তিনজন, মনিরামপুরে দুইজন ও শার্শায় ২১ জন।

উল্লেখ্য, করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৯ জুন দিবাগত রাত থেকে যশোর ও নওয়াপাড়া পৌরসভার সব ওয়ার্ডে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তমিজুল ইসলাম।

এরমধ্যে করোনা পরিস্থিতি প্রতিদিন রেকর্ড ভাঙছে। এরপর গত ১৫ জুন জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির দ্বিতীয় সভায় বিধিনিষেধ বাড়িয়ে যুক্ত করা হয় ঝিকরগাছা পৌরসভা, সদরের উপশহর, নওয়াপাড়া, আরবপুর, চাঁচড়া, শার্শা ইউনিয়ন ও বেনাপোল বাজার।

যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. সায়েমুজ্জামান বলেন, করোনার শনাক্তের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও একটি করোনা ডেডিকেটেট হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। সদর হাসপাতালে করোনা রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেলে সেখানেও রোগী হস্তান্তর শুরু করা হবে। পাশাপাশি লকডাউনে স্বাস্থবিধি মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

মন্তব্য