অবৈধভাবে ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করে সিমকার্ড তুলে রোহিঙ্গাদের কাছে বিক্রি

প্রতারণা করে হাজারো মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি ও বিকাশ প্রতারণাকারী ও রোহিঙ্গাদের কাছে মোবাইল সিম বিক্রি

পার্থ প্রতিম দেব নাথ রতি

যশোর ও নড়াইল জেলায় একটি চক্র সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে, প্রতারণার মাধ্যমে হাজারো সাধারণ মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে মোবাইল সিম উঠিয়ে বিভিন্ন ধরণের অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি, বিকাশ প্রতারণাকারী ও রোহিঙ্গাদের কাছে মোবাইল সিম বিক্রি করছে একটি চক্র, নড়াইল পুলিশের হাতে ৩ প্রতারক গ্রেফতার – মামলা দায়ের

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কোম্পানির মার্কেটিং অফিসার পরিচয় দিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে হরেকরকম কায়দায় প্রতারণার মাধ্যমে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয় পত্র সংগ্রহ করে আসছে। আর এই চক্রটি সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগে তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয় পত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির সিম কার্ড উত্তোলন করে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অপহরণ, খুন চাঁদাবাজি, বিকাশ প্রতারণা ও বিভিন্ন ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ব্যবহারের জন্য চড়া দামে বিক্রি করে।

এবং বেশকিছুদিন ধরে এই চক্রটি অবৈধ সিম কার্ডগুলি নিয়ে বিক্রি করে রোহিঙ্গাদের কাছে। যে কোন কোম্পানির একটি মোবাইল সিমকার্ড কিনতে দেড়শত থেকে দুইশত টাকা লাগে। এই চক্রটি বিভিন্ন নামে অবৈধভাবে মোবাইল সিম কার্ড তুলে সন্ত্রাসী ও রোহিঙ্গাদের কাছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করে। কখনও কখনও প্রয়োজন বুঝে এইগুলি বিক্রি হয় আরও বেশী দামে। এসকল অবৈধ মোবাইল সিম কার্ড ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকান্ড ঘটানোর ফলে বিপদে পড়তে হচ্ছে যাদের নাম ব্যবহার করে মোবাইল সিমগুলো ওঠানো হয়েছে।

এই সকল জালিয়াতির ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় একটি চক্র বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় গিয়ে অত্র অঞ্চলের বেকার কিছু যুবককে কোম্পানির মাঠ পর্যায়ে চাকুরি দেয়, এবং তাদের কাজ দেয় গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষদের কে কোম্পানির প্রচারে কিছু পন্য উপহার যেমন, সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট ইত্যাদি দিয়ে সাধারণ মানুষদের ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয় পত্র সংগ্রহ করা।

কিন্তু মাঠ পর্যায়ের এই সকল বেকার যুবক বুঝতেই পারেনি যে, তারা কখন এই জালিয়াত চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে যুক্ত হয়েছে অবৈধ কাজে। সম্প্রতি গত জুলাই ও আগষ্ট মাসে এমন জালিয়াতির ১২৮টি জিডি হয় নড়াইল সদর থানায়, যার নম্বর- ১০৫৪-১০৬২, ১০৬৪-১০৭৫, ১০৭৭-১০৮২, ১০-৮৬-১০৯৭, ১০৯৯-১১১১, ১১১৪-১১২৫, ১১৪৮-১১৫২, ১১৬০-১১৮০, ১১৮২-১১৮৬, ১১৮৮-১১৯৪, ১১৯৬-১২০১, ১২০৩, ১২০৫, ১২০৮-১২০৯, ১২১১-১২১৪, ১২৪৩-১২৪৫, ১২৫০-১২৫২, ১২৫৫,১৩৩-১৩৭। এরপর নড়েচড়ে বসে নড়াইলের পুলিশ প্রশাসন।

নড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ ইলিয়াস হোসেন এই জিডিগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহন করতে, এএসআই কামাল হোসেনকে অনুসন্ধান পূর্বক জড়িতদের আটকের নির্দেশ প্রদান করেন, নির্দেশ পেয়ে এএসআই কামাল পুরো নড়াইলসহ পার্শবর্তী জেলায় সোর্স নিয়োগ করে ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শুরু করে ব্যাপক অনুসন্ধান। তার অনুসন্ধানে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে ব্যপক তথ্য, এই জালিয়াত চক্রটি শুধু নড়াইল জেলায় নয় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও থানা এলাকায়ও তারা তাদের এই অনৈতিক কর্মকান্ড করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এবং তাদের বিরুদ্ধে যশোরের বাঘারপাড়া সহ বিভিন্ন থানায় একাধিক অভিযোগ ও রয়েছে।

অনুসন্ধানকালে জানা যায়, ১নং আসামী সুমন বিশ্বাস ও ৭নং আসামী আবু সাঈদ সরদারসহ বেশকিছু আসামী এর আগে ও যশোরের বাঘারপাড়া এলাকায় একই ধরণের অপরাধ কার্যক্রম করায় তাদের বিরুদ্ধে বাঘারপাড়া থানায় গত ২১ মে ২০১৯ তারিখে ৪০৬/৪২০/৩৪ ধারায় একটি মামলা রজু হয়, যার নং-১২। এই অনুসন্ধানের ব্যাপারে জানতে চাইলে এএসআই কামাল হোসেন প্রজন্মের ভাবনা কে বলেন,

গত ইং ১৮/০৭/১৯ তারিখ সকাল অনুমান ০৬:০০ ঘটিকা হইতে ইং ২৪/০৭/১৯ তারিখ রাত্র অনুমান ৮ টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জন ব্যক্তি নড়াইল সদর থানাধীন কুড়িগ্রাম সাকিনস্থ জনৈক গোলাম মোস্তফা এর বাড়ীসহ, দক্ষিণ নড়াইল, রামসিদ্ধি, কামকুল, বেতবাড়ীয়া, বাহিরগ্রাম, রঘুনাথপুর, কলোড়া ও আশপাশের বেশকিছু জেলা থেকে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ, শ্রমজীবি, অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত ও সহজ সরল সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও শুভেচ্ছা সরূপ প্রত্যেককে একটি করিয়া ১০০ গ্রাম ওজনের লাইফবয় সাবান দেয় এবং তাদের জাতীয় পরিচয় পত্রের কপি গ্রহণ করে, তার নম্বর ব্যবহার করে ও ফিংগার প্রিন্ট ডিভাইস দিয়ে সফটওয়্যারের এর মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে, অবৈধভাবে টেলিটক মোবাইল কোম্পানীর সিম রিজিষ্ট্রেশন করিয়া নেয়।

ভুক্তভোগীদের বিবরণ মোতাবেক বিভিন্ন এলাকায় আসামীদের ধরতে নড়াইল সদর থানার এসআই পিয়াস কুমার সাহা, এএসআই কামাল হোসেন ও এএসআই সিরাজুল ইসলামসহ একটি ফোর্স বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে থাকে। অভিযান পরিচালনাকালে গত ১৯ অক্টোবর আনুমানিক রাত ১ টার সময় সময় সন্দেহজনকভাবে মাগুরা জেলাধীন শালিখা থানার তালখড়ি নিবাসী স্মরজিত বিশ্বাস এর পুত্র সৌরভ বিশ্বাস (২১) কে তার নিজ বাড়ী থেকে আটক করা হয়। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে সৌরভ বিশ্বাস এবং সে এই কর্মকান্ডে জড়িত অপর সঙ্গীদের নাম প্রকাশ করে। এরপর তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়।

গত ১৯ অক্টোবর এএসআই কামাল ও তার সঙ্গীয় ফোর্স রাত আনুমানিক ২.৩০ মিনিটে যশোর শহরের নিউ বেজপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মানিক শিকদার এর বাড়িতে আত্মগোপনে ভাড়াটিয়া হয়ে থাকা জালিয়াত চক্রের একজন মূল হোতা মাগুরা জেলার গাংনালিয়া (মালন্দ) গ্রামের সুশিল বিশ্বাসের পুত্র সুমন বিশ্বাস (২৬) কে আটক করে। এবং তার স্বীকারোক্তিতে অপর আর এক আসামী নড়াইল জেলাধীন, দক্ষিণ নড়াইল এর শহিদুজ্জামান এর পুত্র জুবায়ের আহম্মেদ (২৫) কে নড়াইল সদর থানাধীন কুড়িগ্রাম সাকিনস্থ মুচিরপোল যাত্রী ছাউনির পাশ থেকে আটক করে।

এসময় পুলিশে তল্লাসিতে তাদের কাছ থেকে ২টি ফিংগার প্রিন্ট ডিভাইজ, একটি স্যামসাং স্মার্ট মোবাইল ফোন, একটি ছোট প্যাড খাতা, ইউনিলিভার কোম্পানির নাম লেখা বেশকিছু কার্ড এবং প্রতিটি ১০০ গ্রাম ওজনের ৩২ পিচ লাইফবয় সাবান জব্দ করে। উক্ত আসামীদের আটকের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে জিডি লিপিবদ্ধকারীরা থানায় হাজির হয়ে আসামীদের সনাক্ত করে।

নড়াইল সদর থানার এএসআই কামাল বাদী হয়ে আটক ৩ জন ও পলাতক হিসেবে দক্ষিণ নড়াইল এলাকার বট্টুখান এর পুত্র সোহান (২৫), কুড়িগ্রাম (বাঁধাঘাট) এলাকার বকুল মুন্সী’র পুত্র আররাফুল ইসলাম (২৫), মাদারীপুর জেলার শিবচর (বড়বিলখী) এলাকার কামরুল হাসান এর পুত্র সুমন মোল্যা (৩৯) ও যশোর জেলার বাঘারপাড়া থানার বাশুয়াড়ী ইউপি চেয়রম্যান আবু সাঈদ সরদারসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে ৪০৬/৪২০/৩৪ সহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬ (৩) এবং টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এর ৭৩/৭৪ ধারায় একটি মামলা দ্বায়ের করেন। এ বিষয়ে নড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ ইলিয়াস হোসেন ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহকারী প্রতারকদের থেকে সাবধানে থাকতে এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি কাউকে না দিতে সাধারণ মানুষদের সতর্ক হওয়ার আহবান জানিয়েছেন।

মন্তব্য