অপরাধ ডায়েরী- ২- যশোরে অহরহ ঘটছে ছুরিকাঘাতের ঘটনা

অপরাধ ডায়েরী

শরিয়তউল্লাহ শুভ

এবছরের ১৯ জুন তারিখে যশোর সরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এ ঘটে চুরিকাঘাতের ঘটনা। যশোর সরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট যশোরের স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান। চলচিলো দুপুরের ক্লাস। ক্লাস চলাকালে শ্রেণীকক্ষের পাশে শয়ন, উৎসব ও মিকাইল নামক তিন কলেজছাত্র ধুমপান করছিল। এসময় একই কলেজের ছাত্র তন্ময়, ইব্রাহিম, মধুসহ কয়েকজন তাদের ক্যাম্পাসে ধুমপান করতে নিষেধ করে।

এ নিয়ে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। একপর্যায়ে ধুমপায়ীরা এ ঘটনা মোবাইলফোনে বহিরাগত বড় কিছু ভাইদেরকে জানায়। কিছুক্ষণের মধ্যে বহিরাগত কয়েকজন উপস্থিত হয় কলেজে। হঠাৎ ধুমপানে বাধা প্রদান করায় কলেজছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী তন্ময়, ইব্রাহিম, সাব্বির ও সোহাগকে ছুরিকাঘাত করে তারা। এরপর দ্রুত তারা স্থান ত্যাগ করে। আহত হয় যশোরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটির চার শিক্ষার্থী।

এরপর ২১ জুন শহরতলীতে আবোরো ঘটে ছুরিকাঘাতোর ঘটনা,
ফাতেমার দাখিল পরীক্ষা সামনে। আর এদিকে প্রেমিক নাজমুলের সাথে কিছুতেই সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কেন জানি অসহ্য লাগছে তাকে। তাই নতুন করে স¤্রাটের সাথে প্রেমজ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ফাতেমা। বিষয়টি অজানা থাকেনি নাজমুলের কাছে। প্রেমিকা ফাতেমার প্রতি অগাধ ভালোবাসায় অন্ধ করে দেয় নাজমুলকে। প্রেমিকাকে হারানোটাকে মেনে নিতে পারছিল না নাজমুল। অপরাধ প্রবনতা ভর করে তার ওপর। ভাবতে থাকে কীভাবে সম্রাটের কাছ থেকে ফাতেমাকে আলাদা করা যায়। কোন কূল কিনারা করতে না পেয়ে অবশেষে সম্রাট হত্যার পরিকল্পনা করে সে। যেই কথা সেই কাজ। নাজমুল আরো ২-৩ জনের সহায়তা নিয়ে সম্রাটকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফলে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নাজমুল ও তার সঙ্গীরা যশোর-মাগুরা সড়কের বাহাদুরপুরস্থ গ্যাসফিল্ডের পাশে সম্রাটকে পেয়ে ছুরিকাঘাত করে। আহত হয় স¤্রাট। পরে তাকে উদ্ধার করে যশোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু স¤্রাটকে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষনা করেন। এ ঘটনার পরে নাজমুলসহ তার সঙ্গীরা ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দেয় সে। আদালত যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরন করে নাজমুলকে। থমকে দাড়ায় একটি জীবন। শেষ হয় একটি পরিবারের স্বপ্ন।

এরকম ঘটনা যশোরে ঘটছে হারহামেশাই। এর অন্যতম কারন প্রথমত প্রাণঘাতি বার্মিজ ছুরি-চাকুর সহজলভ্যতা আর দ্বিতীয়ত প্রশাসনের উদাসীনতা। এজন্যই হাত বাড়ালেই ছুরি চাকু কিনতে পাওয়া যায় ক্রোকারিজের দোকানগুলো ও বিভিন্ন দোকানে। পাশাপাশি অনলাইন থেকে সুন্দর সুন্দর প্রাণঘাতী চাকুর হোম ডেলিভারির ব্যাবস্থা তো আছেই। “দারাজ”, “আজকের ডিল ডটকম”, “অথবা ডটকম”সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় অনলাইন মার্কেটগুলো অবাধে চাকু-চাপাতি বিক্রি করে থাকে। এগুলো আবার দামেও অনেক সস্তা। তাই উঠতি বয়সী তরুণ প্রজন্ম খুব সহজেই এর সংস্পর্শ পেয়ে থাকে। আর সামান্য কারনেই এর অপব্যবহার করে থাকে। যার ফলে বিগত সাল ও চলতি বছরে শুধুমাত্র যশোরে ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি ছুরিকাহতের ঘটনা।

তার কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরা হল:-
গত ২২ জানুয়ারী যশোরের অভয়নগরে এক চানাচুর বিক্রেতার সাথে চানাচুরের দাম নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা জাহিদুল ইসলামকে ছুিরকাঘাত করে হত্যা করে চানরাচুর বিক্রেতা। ০৬ ফেব্রুয়ারী শহরতলীর চাঁচড়া বাজারে ছুরিকাঘাতে নাহিয়ান আল আরেফিন নামে এক যুবক আহত হয়। ৮ ফেব্রুয়ারী শহরতলীর শেখহাটি জোড়াপুকুর এলাকায় প্রেমিক-প্রেমিকাকে হেনস্থার জেরে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মামুন নামে এক যুবক খুন হয়।

২২ ফেব্রুয়ারী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশে সাকিব হোসেন নামে এক শিশু শ্রমিক ছুরিকাহত হয়। ১২ এপ্রিল ঝিকরগাছায় মাসুমা খাতুন নামে এক কিশোরী গৃহবধূ তার সাবেক স্বামীর কাছে ছুরিকাঘাতের শিকার হয়। ১৩ এপ্রিল বাঘারপাড়ায় পারিবারিক কলহের জের ধরে দেবরের ছুরিকাঘাতে জিনিয়া ইয়াসমিন তুলি নামের এক গৃহবধূ নিহত হয়। ২০ শে এপ্রিল যশোর সরকারী এমএম কলেজ ক্যাম্পাসে সাব্বির হাসান নামে এক শ্রমিককে ছুরিকাঘাত করে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।

১৬ মে শহরের শেখহাটি জামরুলতলা এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে জুনাঈদ হোসেন নামে এক যুবক গুরুতর জখম হয়। ২১ মে বাহাদুরপুর জেসগার্ডেন এলাকায় আফনান জুটমিলের সামনে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে জুটমিল শ্রমিক শহিদুল ইসলাম শহিদ নিহত হন। ০৭ জুন শহরের রেলস্টেশন এলাকায় আব্দুল্লাহ খান নামে এক স্কুলছাত্র ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। ১২ জুন মেয়েলি ঘটনার জের ধরে শহরের শংকরপুর সন্ন্যাসী দীঘিরপাড় এলাকায় বন্ধুদের ছুরিকাঘাতে ফেরদৌস নামে এক যুবক খুন হয়।

০৪ আগস্ট প্রেমিককে ফাঁকি দিয়ে অন্যকে বিয়ে করায় রাজিয়া আক্তার সাথী নামে এক নববধূকে ছুরিকাঘাতে জখম করা হয়। ১৪ আগস্ট নেশার ট্যাবলেট না দেয়ায় সুমন শেখ নামে এক ফার্মেসির কর্মচারীকে ছুরিকাঘাত করে মাদকাসক্ত। ২৮ আগস্ট সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নে পালিত বাবার ছুরিকাঘাতে সুমী আক্তার নামে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণী নিহত হয়। ২২ সেপ্টেম্বর বড়বাজারের মাছবাজারে আড়তের পাশে সুজন মিয়া নামে এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

২৭ সেপ্টেম্বর যশোর শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়ায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে সোহাগ হোসেন নামে এক ঠিকাদারি ব্যবসায়ী নিহত হয়। এই রকম আরো অনেক ঘটনা আছে যা সব হয়তো বলে শেষ করা যাবে না। সবার চোখের আড়ালে যশোরের বিভিন্ন স্থানে যে আরো কত ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে তার আন্দাজ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু কতটুকু নিয়ন্ত্রনে থাকছে সেটি প্রশ্নের বিষয়। শুধুমাত্র একটি জেলা শহরে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সমস্ত বাংলাদেশের কি অবস্থা ! তাই নিজে সতর্ক হোন প্রতিবেশী ও পরিবারকে সতর্ক করুন।

মন্তব্য