অপরাধ ডায়েরী-পর্ব-৩ পিতৃতুল্য শিক্ষক যখন ধর্ষক!

অপরাধ ডায়েরী

শরিয়তউল্লাহ শুভ

জিনিয়া আক্তার তিথি (ছদ্মনাম)। বিকালে অন্যান্য সহপাঠিদের সাথে মাদ্রাসায় গেল ধর্মীয় শিক্ষা নিতে। বাবা মায়ের আদরের মেয়ে জিনিয়াকে বাবা ডাকে “পরী-মা” বলে। পরীর মত সুন্দর চেহারায় আর সুন্দর কন্ঠের ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠে অনকের মন মুগ্ধ করে তুলেছে সে। তবে তার এই পবিত্র সুন্দরের প্রতি মাদ্রাসার শিক্ষকের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সকলের অগোচরে। বান্ধবীদের সাতে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে গেলে জিনিয়াকে দেখে বদ বুদ্ধি খেলে মাদরাসার শিক্ষকের।

পড়ানোর এক পর্যায়ে ধর্মীয় গ্রন্থ শিখতে আসা শিক্ষার্থীদেরকে তিনি একজন একজন করে পড়া ধরবেন বলে জানান। এজন্য প্রথমে জিনিয়াকে ধর্মীয় গ্রন্থটি পড়তে বলে অন্য সকলকে বাইরে গিয়ে খেলা করার নির্দেশ দেন মাদ্রাসা শিক্ষক ইমরান হোসেন। শিক্ষকের লোলুপ দৃষ্টি বুঝে ওঠার মত বয়স হয়নি জিনিয়ার। খেলা করতে বাইরে সবাই চলে যায়। আর এদিকে শিক্ষক তখন জিনিয়াকে আলাদাভাবে কুরআন পড়াচ্ছেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই জিনিয়ার চিৎকার শুনতে পায় সহপাঠীরা। তারা দৌঁড়ে চলে আসে এবং আশেপাশের প্রতিবেশীদের ডেকে আনে। পরে জানা যায় শিশু জিনিয়াকে একা পেয়ে ধর্ষনের চেষ্টা করে লম্পট শিক্ষক। তখন এলাকাবাসীর সহায়তায় পুলিশ গ্রেফতার করে লম্পট শিক্ষককে। ধর্ষনের হাত থেকে বেঁচে যায় জিনিয়া তার জীবনে একটি খারাপ অভিজ্ঞতা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে । যদি সেইদিন জিনিয়ার সহপাঠীরা আশেপাশের প্রতিবেশীদের ডেকে না আনতো তাহলে হয়ত ধর্ষনের শিকার হতে হতো তাকে।
ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২১ জুলাই মণিরামপুর উপজেলার উত্তর ভরতপুর নূরানীয়া হাফিজীয়া মাদরাসায়।

এরপর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস দাখিল পরীক্ষা কড়া নাড়ছে আফরোজা সুলতানা (ছদ্মনাম) এর দোর গোড়ায়। তাই মন দিয়ে পড়াশোনা করছে আফরোজা সুলতানা। লক্ষ্য তার ভালোর রেজাল্ট করে বাবা মায়ের মুখ উজ্জ¦ল করা। এদিকে মাদরাসার দাখিল পরীক্ষার্থীদের জন্য সন্ধ্যাকালীন কোচিং চালু করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন দুইজন করে শিক্ষক ১৫-১৭ জন ছাত্রীদের কোচিং করান।

সেদিন অন্য বান্ধবীদের সাথে আফরোজা যায় সান্ধ্য কোচিং করতে। পিতামাতাও নির্ভয়ে মেয়ে সন্তানকে পাঠায় কোচিং করাতে। কিন্তু কথায় বলে “যেখানে আমরা খুজি বিশ্বাস সেখানে গুহায় হায়েনার বাস ”। কোচিংয়ের মৌলভী শিক্ষকের লোলূপ দৃষ্টি পড়ে আফরোজার ওপর। কোচিং শেষে অন্যরা চলে গেলে মাদরাসার সহকারী মৌলভী শিক্ষক নজরুল ইসলাম আফরোজাকে চকলেট খেতে দেয়। চকলেট খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে জ্ঞান হারায়। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে মাদরাসার টয়লেটের পাশে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায় শিক্ষক নজরুল ।

এদিকে অনেক রাত হয়ে গেলেও বাসায় ফেরে না আফরোজা। এ নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে তার পরিবার। অবশেষে রাতে স্বজনরা তার খোঁজে মাদ্রাসায় যায়। কিন্তু মাদরাসাতে তখন কেও নেই। পাহারাদার কুকুরটিও তখন নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেক খোঁজাখুজির পর একপর্যায়ে টয়লেটের গলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তার পরিবার। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নেওয়া হয়। শতচেষ্টা করে তার জ্ঞান ফেরাতে পারেনি কেও। অবশেষে রাত দুইটার দিকে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় মনিরামপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখে মণিরামপুরের ঝাঁপা দক্ষিণপাড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায়।

শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বছরজুড়ে চলছে এ ধরনের ঘটনা। সমাজে নিজেদের অবস্থানের কথা চিন্তা করে ও মান সম্মানের ভয়ে সব ঘটনা হয়ত সামনে আসে না। তবে শিক্ষক নামের হায়েনা যে সবখানে আছে সেটি পত্র পত্রিকায় চোখ বুলালেই বোঝা যায়। বছর জুড়ে চলমান এরকম আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো –

৩ জুন ২০১৮, মণিরামপুরে মাহমুদকাটি-রঘুনাথপুর নামের একটি প্রস্তাবিত প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান কর্তৃক পঞ্চম শ্রেণীতে পড়–য়া এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।
৩০ জুন ২০১৯, ঝিকরগাছায় কাশিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তারেক হোসেনের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে। যার ফলে শিক্ষার্থীটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে।
২ জুলাই ২০১৯, যশোর সদরের বালিয়া-ভেকুটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কৃষিশিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক ইউসুফ আলী টয়লেটে সপ্তম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রীকে ধর্ষনের চেষ্টা করে।

২১জুলাই ২০১৯, মনিরামপুরে শিক্ষার্থীকে ধর্ষনের চষ্টোর অভিযোগে গ্রেফতার হন মাদরাসার শিক্ষক।
৩১ জুলাই ২০১৯, বাঘারপাড়ার বরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান কর্তৃক পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে অফিস কক্ষে ডেকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে।
৩ অক্টোবর ২০১৯, ছাত্রীকে ধর্ষনের অভিযোগে মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে মনিরামপুর থানায় মামলা হয়।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। উল্লেখিত ঘটনাগুলি হয়তো সাংবাদিকদের চোখে পড়ায় বা পুলিশ ফাইলে থাকায় মানুষের কাছে ফুটে উঠেছে। শিক্ষক নামের এসব হায়নাদের কাছে আরো যে কতজনকে যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিণিয়ত তার সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই। কিছু শিক্ষকদের এইসকল কর্মকান্ডে এই মহৎ পেশা ও মানবতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এর নাম কি মানবতা? এইটা কি মনুষ্যত্বের পরিচয়? আজ নদীতে,ড্রেনে ভাসে দেহ আর ডোবে মানবতা। ভূক্তোভোগীদের এই চিৎকার, প্রতিধ্বনি হয়ে যেন শূন্যতায় না হারিয়ে যায়।

সাধারণ মানুষের আশা একদিন হয়তো এ পশুবৃত্তি’র অবসান ঘটবে। শুধুমাত্র একটি জেলায় যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সমস্ত বাংলাদেশের অবস্থা কি সেটি ভাববার সময় এসেছে। তাই নিজে সতর্ক হোন, অন্যকে সতর্ক করুন। নিজের সন্তানের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন।

মন্তব্য