আহা পরকীয়া !

অপরাধ ডায়েরী

প্রতি রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদনঃ অপরাধ ডায়েরীঃ পর্ব-৫

শরিয়তউল্লাহ শুভ

যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের শালতা গ্রামের হাফিজুর রহমান। ২০০৪ সালে সাবিনা নামক একজনকে বিয়ে করেন তিনি। বেশ সুখেই কাটছিল তার সংসার। কিন্তু হঠাৎই তাদের সংসারে পড়ে পরকীয়ার কালো থাবা। তার স্ত্রী সাবিনা একই এলাকার মিনারুল নামক এক ব্যক্তির সাথে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিষয়টি জানাজানি হয়। অনেক ভাবনা চিন্তা করে মিনারুলকে শর্তসাপেক্ষে ক্ষমা করে দেন হাফিজুর।

তবুও ভাঙা আয়না যেমন জোড়া লাগে না তেমনি জোড়া লাগেনি হাফিজুরের সংসার। লোক লজ্জার ভয়েই হোক আর পারিবারিক বা সামাজিক চাপেই হোক হাফিজুর তালাক দেন ভালোবাসার স্ত্রী সাবিনাকে। কিন্তু সাবিনাকে হারানোর ব্যাথা তিনি ভুলতে পারেননি। আর এ বেদনার জন্য স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক মিনারুলের ওপর রাগ পুষে রেখেছিল হাফিজুর। তার মনে হয় এসব কিছুর জন্য হাফিজুরই দায়ী।

সে না থাকলে তার সুখের সংসার ভেঙে যেত না আর তার ভালোবাসার স্ত্রীকেও তালাক দিতে হত না। সাত পাচ ভেবে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠেন হাফিজুর। এরপর অনেক দিন কেটে যা। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন সেই ছাইচাপা আগুন অগ্নিগিরিতে রূপ নেয়। ঘটনার ১৫ বছর পর চলতি বছরের ১৪ আগস্টে হাফিজুর খুন করেন স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক মিনারুলকে। ঘটনার দিন রাতে সুযোগ বুঝে মিনারুলকে বাড়ির পাশে একটি বাগানে নিয়ে যায় হাফিজুর। সুযোগ বুঝে তার কাছে থাকা দা দিয়ে কুপিয়ে মিনারুলকে হত্যা করে। পরে পালিয়ে যায় সে।

এদিকে এ হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। কোন ভাবেই যখন রহস্য উদঘাটন করা যাচ্ছিল না তখন পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিকেশন ) -কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও পিবিআই এর উন্নত প্রযুক্তির জালে আটকা পড়েন হাফিজুর। শেষ খবর পাওয়া অবধি গ্রেফতার হয়ে হাজতবাসে আছেন এখনো।
সদর উপজেলার পুলেরহাট-মন্ডলগাতি গ্রামের মৃত তরিকুল ইসলামের ছেলে হোসেন রুবেল হোসেন। থাকেন শহরের মনিহার এলাকার একটি ভাড়াবাড়িতে। স্ত্রী ও সন্তানাদি নিয়ে তার সংসার চলছিল ভালোই।

কিন্তু চৌগাছা উপজেলার কাকুড়িয়া-নওদাপাড়া গ্রামের আব্দুস সাত্তারের মেয়ে কল্পনা বেগমের সাথে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কল্পনা ছিলেন তালাকপ্রাপ্তা। দুই মেয়ে নিয়ে শহরতলীর কিসমত নওয়াপাড়া হাইওয়ে মডেল টাউনে বাড়িভাড়া থাকতেন। একদিন রাতে রুবেল কল্পনার বাসায় যায়। সেখানে রুবেল এবং কল্পনা ইয়াবা সেবন করে। এরপর মদ্যপান করে রাত্রি যাপন করে সেখানে। পরদিন রুবেল বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে দেখার জন্য যেতে চায়। কিন্তু কল্পনা তাকে যেতে দিতে রাজি হয়নি।

এ নিয়ে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। একই বিষয় নিয়ে ঐদিন সন্ধ্যায় দুইজনের মধ্যে অনেক কথা কাটাকাটি হয়। রাগের বশে হাতের কাছে থাকা একটি স্লাইড রেঞ্জ দিয়ে কল্পনার মাথায় আঘাত করে রুবেল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কল্পনা। এরপর আবার মাথায় আঘাত করে রুরেল। এতে মারা যায় কল্পনা। রুবেল যখন বুঝতে পারে কল্পনা মারা গেছে তখন হত্যার বিষয়টি ধামা চাপা দিতে তার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলিয়ে দেয় ঘরে। এরপর কল্পনার মেয়েকে ডেকে আত্মহত্যা করেছে বলে পালিয়ে যায় রুবেল।

এঘটনায় মামলা হয়, পুলিশ আসে, তদন্ত করে। কিছুদিন পর খুনের সাথে যুক্ত থাকা সন্দেহে ঘোপ এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রহস্যের অবসান ঘটে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দেয় রুবেল। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ভাবতে হবে পরকীয়া প্রেমিক প্রেমিকার শেষ পরিণতি কী হল। প্রেমিকার মৃত্যু আর প্রেমিক জেলে। কিন্তু তাদের দুজনের ঘরেই সন্তানাদি আছে কী হবে তাদের পরিনতি? কোথায় ঠাই পাবে তারা? তবে থেমে নেই পরকীয়ার মত সামাজিক ব্যধি। প্রতিনিয়ত ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। অহরহ ভাঙছে সংসার, হচ্ছে খুন।

চলতি বছরে শুধুমাত্র যশোরেই পরকীয়ার বলি হতে হয়েছে অনেককে। তার কয়েকটি তুলে ধরা হল: ১৩ এপ্রিল ২০১৯ বাঘারপাড়ার পান্তাপাড়ায় স্বামীর পরকীয়া প্রেম ও যৌতুকের বলি হয় ২ সন্তানের জননী গৃহবধু জিনিয়া ইয়াসমিন তুলি। ১৪ এপ্রিল ২০১৯, চৌগাছা উপজেলায় পরকীয়ার জেরে তিনজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তিন সন্তানের জনক আবদুর রশিদ, তার স্ত্রী আছমা খাতুন ও পরকীয়া প্রেমিকা দুই সন্তানের জননী ডলি খাতুন কীটনাশক পান করেন। ৫ মে ২০১৯, স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিকের হাতে নিহত হন বেনাপোল পোটর্ থানার পাটবাড়ি এলাকার মুদি দোকানি সালাম।

১৫ মে, ২০১৯, বেনাপোলে জামাল হোসেন নামের এক মালয়েশিয়া প্রবাসী স্ত্রী ও তার পরকীয়ার প্রেমিক দ্বারা হত্যার শিকার হন। ২১ মে ২০১৯, ‘পরকীয়ার জেরে’ আফনান জুট মিলের শ্রমিক শহীদ কাজী ছুরিকাঘাতে নিহত হন।২০জুন ২০১৯ পরকীয়ার কারনে চৌগাছার চার সন্তানের জনক সাইফুল ইসলাম নামে এক কৃষক বিষপানে আত্মহত্যা করেন। ২৬ জুলাই ২০১৯, মনিরামপুরে স্বামীর পরকীয়ায় বাধা দেয়ায় স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিমানে দুই সন্তানের জননী হীরামন বিবি আত্মহত্যা করেন। ১৪ আগস্ট ২০১৯, যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের শালতা গ্রামে পরকীয়া প্রেমিকার সাবেক স্বামীর দ্বারা কৃষক মিনারুল খুন হয়। ২৮ আগস্ট ২০১৯, স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে ঝিনাইদহ এলজিইডির গাড়িচালক এটিএম হাসানুজ্জামান জগ্যলুকে হত্যা করা হয়।যার লাশ যশোর সদরের সাতমাইল এলাকা হতে উদ্ধার করা হয়।

উল্লেখিত ঘটনাগুলি হয়ত পুলিশের কাছে রিপোর্ট হওয়ায় বা শেষ পরিনতিতে পৌঁছানোর পর সকলের চোখের সামনে এসছে। কিন্তু গোপনে যে কত ঘর ভাঙছে, কত তালাক, কত আত্মহত্যা হচ্ছে তার ফাইল আমাদের কাছে নেই। শুধুমাত্র একটি জেলা শহরে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সমস্ত বাংলাদেশের কি সেটি ভাবতে হবে আমাদের। আজ সময় এসেছে সতর্ক ও সাবধান হওয়ার। নিজে সাবধান হোন এই ধরণের অপরাধ হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।

মন্তব্য