‘লাশ কাটলে বাজার হয়, না হলে নয়’

প্রজন্ম ডেস্ক 

‘প্রতি লাশ কাটার বিনিময়ে মাত্র দুই থেকে তিনশ টাকা পাই। আর বেওয়ারিশ লাশ থেকে কোনো টাকা পাই না। প্রতিদিন লাশ আসে না। যেদিন লাশ আসে না, সেদিন আমার বাজারও হয় না।’ এভাবেই আক্ষেপ নিয়ে মনের কথাগুলো বলছিলেন তাজুল ইসলাম।

হবিগঞ্জ জেলা শহরের জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা এই তাজুল ইসলাম। তিন ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে দরিদ্র তাজুলের সংসার। নিজের জমি না থাকায় সরকারি জমিতে ছোট বাড়ি করে পরিবার নিয়ে তার বসবাস।

১৯ বছর বয়সে ডোমের পেশা বেছে নেন তাজুল। সেই থেকে এ পর্যন্ত হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ডোমের দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। এখন তার বয়স প্রায় ৫০ বছর। প্রধান ডোম ছাবু মিয়া মারা যাওয়ার পর তাজুল ইসলাম এই হাসপাতালে একাই লাশ কাটার দায়িত্বে আছেন। এ পর্যন্ত প্রায় আট হাজার লাশ কাটা ছেঁড়া করেছেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘লাশ কাটা ছেঁড়া করতে করতে আমার জীবনের প্রায় ৩১ বছর অতিবাহিত হয়েছে। জীবনের বাকী সময়টুকুও এভাবেই যাবে। এটাই আমার ইচ্ছা। আমি কোনদিন দায়িত্বে অবহেলা করিনি। মা মারা যাবার দিনও তাকে দাফন করে এসে লাশ কেটেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত আমার চাকরি স্থায়ী হয়নি। যিনি স্থায়ী ছিলেন তিনি মারা গেছেন। বর্তমানে আমি একাই লাশ কাটি। যেদিন লাশ থাকে না, সেদিন আমার বাজারও হয় না। না খেয়ে পারিবার নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয় আমাকে।’

তাজুল আরো বলেন, ‘আমার নিজের কোনো জমি নেই, পরিবার নিয়ে সরকারি জমিতে বাস করি। এ পর্যন্ত প্রায় আট হাজার লাশ কেটেও চাকরি স্থায়ী হয়নি আমার। কারো মায়াও হয় না আমার প্রতি। আাম গরিব মানুষ। তাই, ডোমের চাকরি স্থায়ী করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো দাবি জানাই।’

হাসপাতাল এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তাজুল ইসলাম লাশ কাটায় পারদর্শী। কিন্তু তার চাকরি স্থায়ী হয়নি। সে দরিদ্র মানুষ। সামান‌্য বসতভিটাও নেই। তার চাকরি স্থায়ী হলে পরিবার নিয়ে সে এই বৃদ্ধ বয়সে একটু ভাল থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক ডাক্তার রাইজিংবিডিকে জানান, ডোম ছাবু নেই। তাতে আমাদের বেগ পেতে হয়নি, ডোমের দায়িত্ব পালন করছেন তাজুল ইসলাম। সে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করে। দায়িত্বে কোন অবহেলা করে না।  লাশ আসলে দ্রুত কাটা ছেঁড়া করতে পারে। সে এ বিষয়ে বেশ দক্ষ।

শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির রেলপথের লাশ সংগ্রহকারী আবুল কালাম জানান, ডোম তাজুল ইসলাম দ্রুত লাশ কাটা ছেঁড়া করতে পারেন। তিনি বেওয়ারিশ লাশ প্রায় বিনা টাকাতেই কাটা ছেঁড়া করেন।

একাধিক থানা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাশ কাটায় তাজুল ইসলাম খুব দক্ষ। জরুরি প্রয়োজনে তাকে সব সময় পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে তার ডোমের চাকরি স্থায়ী করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় পড়লে তার (তাজুল ইসলাম) চাকরি স্থায়ী করা সম্ভব।

মন্তব্য