তাজরীন ট্র্যাজেডি: ‘এর নাম কি জীবন?’

প্রজন্ম ডেস্ক 

‘‘এত কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে আল্লাহ যদি নিয়ে যেত তাহলে ভালো হতো। বেঁচে আছি, কিন্তু একটা হাত অকেজো, কোমর ভাঙা, পা ভাঙা, এর নাম কি জীবন?’’

অনেক কষ্ট নিয়ে এভাবে বলছিলেন তাজরীন ট্র্যাজেডিতে বেঁচে ফেরা রেয়াজুল ইসলাম।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়া এলাকার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ১১৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু পাশাপাশি আহত হয় তিন শতাধিক শ্রমিক। আহত শ্রমিকেরা অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে বেঁচে আছে।

তারা সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাময়িক কিছু সহায়তা পেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পাননি। বহু পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়ে ঘোর বিপদে পড়ে।

তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর কেটে গেছে। তবে সেই দিন এখনো চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে রেয়াজুলের। তিনি জানান, সন্ধ্যায় হঠাৎ আগুনের অ্যালাম বেজে ওঠে। মুহূর্তে ধোঁয়া ছড়িয়ে যায় কারখানাজুড়ে। এ সময় দিগ্বিদিক ছুটতে ছুটতে লাফিয়ে পড়েন তিনি। তারপর তার আর কিছু মনে নেই।

রেয়াজুল বলেন, ‘‘জ্ঞান ফেরার পর জানলাম হাত, পা আর কোমর ভেঙে গেছে। এরপর থেকে কী জীবন পার করছি তা বোঝানো যাবে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘সেদিন ধোঁয়ার মধ্যে লাফিয়ে পড়েছিলাম। যার উপর পড়েছিলাম তিনি আমার ফ্লোরের ছিলেন; আমার কাছের বন্ধু। আমার নিচে পড়ে থাকা সেই বন্ধুটি মারা যায়। আজও সেদিনের কথা ভুলতে পারিনি। কয়েক ঘণ্টা আগেও আমরা একসঙ্গে কাজ করছিলাম, তারপর এত কিছু।’’

রেয়াজুল বলেন, ‘‘সেদিন যদি মরে যেতাম ভালো হতো। সেই দৃশ্য ভুলতে পারি না। কোথায় ছিলাম! কি হলো? আর আজ কীভাবে বেঁচে আছি! সমাজে ভালোভাবে চলতে পারি না। নিজের কাজটাও ঠিকমত করতে পারি না।’’

তৈরি পেশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া টাকা দিয়ে আশুলিয়ায় মুদি দোকান দিয়েছেন রেয়াজুল। দোকান দিলেও তাতে খুব বেশি আয় হয় না। কম পুঁজি, আবার চিকিৎসাও শেষ হয়নি। কিছু দিন পরপর হাসপাতালে যেতে হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে সবার আবদার মেটাতে না পারার অসহায়ত্বের কথাও জানালেন তিনি।

রেয়াজুল বলেন, ‘‘মানুষের করুণার পাত্র হতে চাই না বলে কাজ করে খাই। কিন্তু এটাকে বাঁচা বলে না। স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে থাকি। দুর্ঘটনার সময় বাচ্চাটার বয়স ১১ মাস। এখন সে আট বছর বয়সী। স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু বাবা হিসেবে তার কোনো শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে পারি না। দোকান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে ঘর ভাড়া, খাওয়া হয় কোনো রকমে।’’

সরকারের প্রতিশ্রুত সব সহায়তা পাননি বলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সরকার বলেছিল ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু তা করেনি। এখন সেটা কারো কাছে বলার সুযোগও নেই। তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের দিবসে অনেকে খোঁজ নেয়, তারপর আর মনে রাখে না।

প্রকৃত পুনর্বাসন করার জন্যে সরকার ও বিজিএমইএ’র উদ্যোগ নেয়ার দাবি করেন তিনি।

মন্তব্য