ডাকাতির মুখোমুখি

অপরাধ ডায়েরী

রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদন – অপরাধ ডায়েরী – পর্ব-৬

শরিয়তউল্লাহ শুভ

গভীর রাত, চারদিকে শুনসান নিরবতা। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের মাঝিয়ালি গ্রামের সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ সে ঘুমের যবনিকাপাত ঘটে একটি আত্মচিৎকারে। ঘুম থেকে উঠে অনেকেই বুঝতে পারে না কি হয়েছে। হঠাৎ করেই গ্রামে রটে যায় মনসুর আলীর বাড়িতে একদল ডাকাত হামলা করেছে। কথা রটে যাওয়া মাত্রই গ্রামের মানুষ সকলে ছোটে মনসুর আলীর বাড়ির দিকে।

এদিকে মনসুর আলীর বাড়িতে আক্রমন করা ডাকাতরা ডাকাতি করার সময় মনসুর আলীর স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে। এতে করে তার স্ত্রীর মাথা ফেটে যায়। সহসা ডাকাতরা বুঝতে পারে মনসুর আলীর বাড়িতে তাদের আগমনের বিষয়টি টের পেয়ে গেছে গ্রামবাসী। তখন তারা পালাতে শুরু করে। কিন্তু একজন পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে মনসুর আলীর বাড়ির দিকে ছুটে আসা জনতার হাতে। এসময় গণপিটুনীর শিকার হয় ঐ ডাকাত। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। পরে পুলিশ গিয়ে তার লাশ উদ্ধার করে। ঘটনাটি গত বছর মে মাসের ১৬ তারিখে ঘটে।

তবে এধরনের ঘটনা থেমে নেই। একের পর এক চলছেই এরকম ডাকাতির ঘটনা।
চলতি বছরের মে মাসের ৯ তারিখে যশোরে মহাসড়কে ঘটে একটি ডাকাতির ঘটনা। ঝিনাইদহের সবজি ব্যবসায়ী শিপলু। ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে ৬টি নসিমনে করে মিষ্টি কুমড়ো নিয়ে যশোরের বাজারে আসে। সদাই হওয়ার পর সে ফিরে যাচ্ছিল ঝিনাইদহের দিকে। ফিরে যাওয়ার পথে রাত প্রায় ২টার দিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অদুরে বেলতলায় নছিমন পৌছায়। কিন্তু শিপলু দেখে রাস্তার ওপর গাছ কেটে আড় করে রাখা হয়েছে।

কোনকিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা দেখতে পায় ২০/২২ জন যুবক প্রত্যেকটি গাড়ির কাছে গিয়ে চালকদের মারপিট করে টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় কেও কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছিল না। তাছাড়া ডাকাতদের হাতে অস্ত্র ছিল। শিপলু ছিল সবথেকে পেছনে। ডাকাতদের হাত থেকে বাচতে নছিমন নিয়ে দ্রুত পেছন দিক দিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে শিপলু।

এসময় দুইজন ডাকাত একটি গাছি দা দিয়ে পলায়নরত শিপলুকে আঘাত করে। এতে তার বা’হাতে তিনটি স্থান জখম হয়। এরপর ধরাশায়ী করে তার পকেটে থাকা বেশ কিছু টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় তারা। এরপর একে একে প্রত্যেক নসিমন চালকের কাছ থাকা যাবতীয় টাকা নিয়ে নেয়া হয়। অসহায় শিপলুদের করার কিছুই ছিল না সেদিন।

অবিরত ধারায় চলছে মহাসড়কে আর বাড়িতে ডাকাতের হামলা। সাধারন মানুষ যেন এই ডাকাতদের হাতে জিম্মি। কখনো কখনো তারা নিজেরা ডাকাতির টাকা ভাগাভাগি করা নিয়ে নিজেরাই বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। চলতি বছরেই ঘটে এরকম কয়েকটি দুধ্বর্ষ ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করা হল:
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের চুড়ামনকাটি বাজারের পাশে গাছের গুড়ি ফেলে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা দুই গাড়ি চালককে কুপিয়ে জখম করে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন গাড়ি থেকে নগদসহ ১০/১২ লাখ টাকার মালামাল লুট করেছে।৪ মার্চ, ২০১৯ নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।

২ এপ্রিল ২০১৯ ভোর রাতে যশোর-মণিরামপুর সড়কের বাজুয়াডাঙ্গা-সাতমাইল এলাকায় ডাকাতির কবলে পড়েন ৯টি ট্রাক চালক ও হেলপার।৯ মে ২০১৯, যশোর-চৌগাছা সড়কের বেলতলায় গাছ ফেলে ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা।১৪ মে ২০১৯, যশোর মাগুরা সড়কের নোঙ্গরপুর এলাকায় দুদল ডাকতের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে ১ জন নিহত হয়। ৯ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার রাতে ঝিকরগাছা উপজেলার রাজাপুর, চাঁপাতলা ও বর্ণী গ্রামের চার বাড়িতে ডাকাতি হয়। ডাকাতরা ৮১ হাজার টাকা, স্বর্ণালংকাসহ তিন লাখ ২১ হাজার ৭০০ টাকার মালামাল লুটে নেয়।

২৫ অক্টোবর ২০১৯, যশোরে অস্ত্রসহ চার ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।২৭ অক্টোবর ২০১৯, যশোর-নড়াইল সড়কের তারাগঞ্জ বাজারের পাশে কালীদাস অধিকারী ও হরিদাস অধিকারীর বাড়িতে ২লাখ ৯০ হাজার নগদ টাকা ও ১৮ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে ডাকাতরা।

২৭ নভেম্বর ২০১৮ যশোর সদর উপজেলায় দোগাছিয়া গ্রামে ডাকাতি মামলায় আটকের পর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সেলিম নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়।
একটি ডাকাতির ঘটনায় শেষ হয় একজন ব্যক্তি বা পরিবারের সকল স্বপ্ন আর আশা ভরসা। অপরদিকে ডাকাতরা বা তার পরিবার কখনোই সমাজে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে না। আর না তারা আত্মপরিচয়ে গর্বিত হতে পারে।

একদিন না একদিন তাকে পুলিশের হাতে ধরা খেতেই হবে। সকল অপরাধীর শেষ স্থান খুবই ভয়ানক। তাই নিজে সচেতন হোন আর সকলকে সচেতন করুন। সচেতনতাই পারে সকল অপরাধকে রুখে দিতে।

মন্তব্য