কি দোষ ছিলো নবজাতকের !

অপরাধ ডায়েরী

প্রতি রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদন : অপরাধ ডায়েরী : পর্ব – ৭

শরিয়তউল্লাহ শুভ

যশোরের অন্যতম একটি বিদ্যাপীঠ নবকিশলয় স্কুল। বিদ্যালয়টির অবস্থান সকলেরই নজর কাড়ে। এর একদিকে যশোর জিলা স্কুল এবং পাশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি পুকুর। শহরের ব্যস্ততম এই রাস্তাটির নাম ভোলাট্যাংক রোড।

সেদিন সকাল থেকেই নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে সবাই। কিন্তু হঠাৎই সবুর মিয়ার চোখ পড়ে রাস্তার পাশে পুকুরের দিকে। সেখানে তিনি কিছু একটা দেখতে পান। কৌতুহলবশত কাছে গেলে দেখতে পান একটি নবজাতকের লাশ। প্রথমে তিনি সেটাকে পুতুল ভেবেছিলেন। পরে কাছে এসে বুঝতে পারেন সদ্য জন্ম নেওয়া রক্ত মাংসের শরীরের একটি ফুটফুটে শিশু। কিন্তু মৃত।

ঘটনার আকস্মিকতায় আঁতকে ওঠেন তিনি। ইতিমধ্যে সেখানে আরো অনেকেই জড়ো হয়। পরে পুলিশ এসে নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে। ঘটনাটি ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর তারিখের। মনিরামপুরের হরিহর নদীতে মাছ ধরতে যান মফিজুর রহমান। রাতের বেলায় মাছ ধরে কিছুটা লাভবান হওয়া যায়। তাই অন্যান্য দিনের মত সেদিন রাতেও তিনি যান মাছ ধরতে। কিন্তু হঠাৎ করে তার নাকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসে।

তিনি মনে করেন নদীতে কখনো কখনো মৃত জীবজন্তু ফেলে দেয় অনেকে। এরফলে পচা দুর্গন্ধ আসছে হয়তো। কোনদিক থেকে দুর্গন্ধ আসছে তা খুঁজতে গিয়ে তিনি অদূরে একটি একটি প্যাকেট দেখতে পান। মনে কৌতুহল জাগে তার। প্যাকেটটির কাছে যেতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। একটি নবজাতকের অর্ধগলিত দেহ ছিল সেটি। মুহুর্তেই রটে যায় ঘটনাটি। উৎসুক জনতা ভীড় করে সেখানে।

পরে পুলিশ এসে নবজাতকের লাশটি উদ্ধার করে। তবে ঘৃনিত এধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে একেরপর এক। বছর জুড়ে যশোর জেরার কোথাও না কোথাও ঘটছে এধরনের ঘটনা। কখনো কখনো হত্যা করা হচ্ছে সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতককে। বর্নননাকৃত দুইটি ঘটনাতে নিশ্চিত যে শিশু দুইটি কোন কুমারী মেয়ের অবৈধ গর্ভপাতের শিকার। ভ্রুণহত্যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি অন্যতম নৈতিক অবক্ষয়ের কারন হয়ে দাড়িয়েছে।

শুধুমাত্র চলতি বছরে পুলিশ ফাইলে থাকা এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরা হল: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, কেশবপুরের বুড়ি ভদ্রা নদীর তীরে কার্টুনে মোড়ানো অবস্থায় একটি নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৫ জুলাই ২০১৯, মনিরামপুরের খাল বাটবিলা এলাকার পাকা সড়কের পাশ থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, অভয়নগরের কাপাশহাটি গ্রামের বিপরীতে ভৈরব নদ ব্রিজ সংলগ্ন রেললাইনের পাশে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ২/৩ দিন বয়সের একটি নবজাতক উদ্ধার করা হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বড়েঙ্গা এলাকার ব্রিজের নিচে আপার ভদ্রা নদীতে এক অজ্ঞাত নবজাতকের গলিত লাশ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। ২৩ নভেম্বর, ২০১৯, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ষাটবাড়িয়া গ্রামের রাস্তা থেকেএকটি নবজাতক শিশু উদ্ধার করে এলাকাবাসী। ২৫ নভেম্বর ২০১৯, মণিরামপুর হরিহর নদী থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

একটি শিশু যে এসেছিল তার নিষ্পাপ হাসি আর আহ্লাদে পৃথিবীটাকে ভরিয়ে দিতে। তাকেই আজ মরতে হচ্ছে তার জন্মদাত্রী মায়ের হাতে অথবা আমাদের সমাজের নিয়মের কাছে ও লোক লজ্জার ভয়ে। যে মায়ের কোল সন্তানের সবথেকে বড় আশ্রয় সেই মা আজকে জমদূত হয়ে হত্যা করছে সন্তানকে।

এধরনের ঘটনা বাংলাদেশে অহরহ। কখনো নদীতে, কখনো রাস্তায় বা ডাস্টবিনে প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে নবজাতক শিশু। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া নবজাতককে নিয়ে কুকুরে টানাটানি করতে দেখার অভিজ্ঞতাও আমাদের হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় এধরনের ঘটনায় কোন মামলা হয়না। পর্যাপ্ত স্বাক্ষী-প্রমাণও মেলে না।

এজন্য পৃথিবীর মুখ দেখার পূর্বেই নিষ্পাপ শিশু হত্যাকারীদের কোন বিচার হয়না। বড়বড় খুনের মামলার আসামীদের জেল হয়, ফাঁসি হয়। কিন্তু ভ্রুন হত্যাকারীরা পার পেয়ে যায়।
জন্মের পরই জীবন্ত নবজাতককে রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো নবজাতক শিয়াল-কুকুরের খাবারে পরিণত হচ্ছে।

কিছু নবজাতক অনাত্মীয় গুটি কয়েক মানুষের দয়ায় পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীবন্ত নবজাতককে ফেলে দেওয়াই সব সমস্যার সমাধান কি না। নবজাতক ফেলে দেওয়ার পর, তাকে মৃত বা জীবন্ত উদ্ধারের পর নবজাতকের অদৃশ্য জন্মদাত্রী মা নিজের বুকের ধন কীভাবে রাস্তায় ফেলে দিলেন ? ভালোবাসার প্রমান স্বরূপ প্রেয়সীকে ভোগ্যবস্তু মনে করে অনেকে।

এতে করে অনেকসময় মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে যায়। সামাজিক অবস্থান ও মান সম্মানের কথা চিন্তা করে ঘটে গর্ভপাতের মত এমন ঘটনা। তাই নিজে সতর্ক হোন। অপরকে সতর্ক করুন। আমাদের সচেতনতায় পারে অপরাধকে রুখে দিতে।

মন্তব্য