বহুমুখি সমস্যায় যশোরের মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা

বহুমুখি সমস্যায় যশোরের মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা

শরিয়তউল্লাহ শুভ

লেখাপড়ার শহর যশোর। একাধিক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নামিদামি স্কুলের জন্য শিক্ষার্থীদের অভয়ারণ্য বলা হয় যশোরকে। কিন্তুু নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে মেসে থেকে লেখাপড়ারত শিক্ষার্থীদের।

যার কারনে শিক্ষার্থীদের অভয়ারণ্য যশোর আজ মহাসংকটে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী আর কলেজ হোস্টেলে স্বল্প আসন শিক্ষার্থীদেরকে বাসা ভাড়া নিয়ে মেস বানিয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। যশোরের স্বনামধন্য সরকারী মাইকেল মধূসুধন কলেজ, সিটি কলেজ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ, বিসিএমসি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়, সরকারী পলিটেকনিক কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজে পড়াশোনার জন্য বাইরের জেলা থেকে অনেক শিক্ষার্থীরা আসে যশোরে।

নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙা, খুলনা জেলাসহ যশোরের অন্যান্য উপজেলা হতে আগত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদেরকে কলেজের হোস্টেলে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়না। তাই যশোর শহরের অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে ছাত্রাবাস।

কিন্তু এই ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের শোষণ করে চলেছে। এসকল সুবিধাবাদীরা বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করে।

ছাত্রাবাসগুলোতে ব্যবহৃত ইন্টারনেট লাইন, রান্নার ভূষি, রান্নার কাঠ, রাজনৈতিক মিছিলে অংশগ্রহন ও চাঁদাবাজির জ্বালাতনে বেশীরভাগ ম্যাসের শিক্ষার্থীরা অস্থির হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, ব্যহত হচ্ছে পড়াশুনা, জীবনের ভয়ে চুপ করেই থাকতে হচ্ছে তাদের। প্রতিবাদ করার মতো সাহস যোগাতে পারছে না তারা।

ছাত্রাবাসগুলোতে রান্নার জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিমান ভূষি, স্থানীয় সুবিধাবাদী চক্র ভয় দেখিয়ে বেশী দামে ভূষি কেনার জন্য বাধ্য করে শিক্ষার্থীদের। ভয়ে মানহীন ও পরিমানে কম ভূষি চড়া দামে কিনতে হয় শিক্ষার্থীদের। বাইরে থেকে ভূষি বা কাঠ কিনতে দেওয়া হয়না তাদের। কিনতে গেলে হুমকী ধমকী দেওয়া হয়। এ চিত্র অহরহ দেখা যায় যশোরের প্রায় সব এলাকায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক নামধারী নেতাদের অনুসারী হিসেবে নাম ভাঙ্গিয়ে, এইসব সুবিধাবাদীরা এলাকা ভাগ ভাগ করে নিয়েছে। ঐসব এলাকার ভেতরে অন্য এলাকার কেউ ব্যবসা করতে পারবে না।

বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা যশোর। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যশোরে বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহার। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশুনা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়েছে।

গ্রাহকদের চাহিদামতো ইন্টারনেট সেবা দিতে ন্যাশনাল আইটি প্রতিষ্টান আম্বার আইটি, আমরা নেটওয়ার্ক, লিংক থ্রি এর মতো আরো বেশ কিছু সনামধন্য কোম্পানী যশোরের সব এলাকায় বাড়ি এবং মেসগুলোতে কম খরচে ভালো মানের ইন্টারনেট সেবা দিতে চাইলেও এলাকার এইসব সুবিধাবাদীদের চাপে বেশীরভাগ এলাকায় ইন্টারনেট সেবা দিতে পারছে না কোম্পানীগুলো।

স্থানীয় সুবিধাবাদীরা ক্ষমতা দেখিয়ে বাড়িতে এবং মেস এর শিক্ষার্থীদের কাছে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়ার নামে খারাপ মানের ইন্টারনেট দিয়ে এক প্রকার চাঁদাবাজি করছে। সেবার মান খারাপ হলেও ভয়ে কোন শিক্ষার্থী মুখ খুলতে পারছে না।

পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন সময় এইসব অসাধু গোষ্ঠীর অসৎ কার্যাবলির সংবাদ প্রকাশ করা হলেও কার্যত তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। কারবালা এলাকার স্থানীয় এক সন্ত্রাসী স্থানীয় শিক্ষার্থীদেরকে জিম্মি করে নামমাত্র ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কখনও কখনো একমাসে দুইবারও ইন্টারনেট বিল দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। কম ব্যন্ডউইথ দিয়ে বেশী গ্রাহকের সেবা দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্খিত সেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে মাস শেষে মোটা অংকের টাকা গুনতে হচ্ছে ঠিকই। এছাড়া ইন্টারনেট সংযোগ সংক্রান্ত কোন সমস্যা হলে ঐ অসাধু চক্রের কাছ থেকেই ঠিক করে নিতে হয়। এতে গুনতে হয় দ্বিগুন বা তিনগুন টাকা।

এই সকল সমস্যার মধ্যে সবথেকে বড় সমস্যা হলো জোরপূর্বক মিছিলে যোগদান। শিক্ষার্থীদেরকে জোর করে মিছিলে নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন সভা সমাবেশ হলেই মেসের ছেলেদের ডাক পড়ে। তাদের পড়াশুনা বা সামনে পরিক্ষা এইসব দেখার সময় নেই। এক্ষেত্রে অসুস্থতা, পড়াশুনা বা পরীক্ষার দোহাই দিলে গালিগালাজ শুনতে হয়।

তাদের হুমকী ধমকী আর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করলেই মেসে থাকা অসম্ভব হয়ে দাড়ায়।
সাধারনত উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে বেশী জনসমাবেশ দেখানোর চেষ্টা করে এই সুবিধাবাদিরা। যার কারনে মেস শিক্ষার্থীদের বিপদের শেষ নেই। যশোরে পড়াশুনা করতে এসে পড়তে হচ্ছে বেশ বিপদে।

দীর্ঘদিন যাবৎ চলমান এ সমস্যার কোন সমাধান হচ্ছে না। এতদ্বসত্তেও কোন শিক্ষার্থীই ভয়ে মুখ খোলেনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, টাকার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশী তাই এ ব্যাপারে নো কমেন্টস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এভাবে চলতে পারে না। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে আমরা যেন নিজ দেশেও পরবাসী হয়ে আছি। এসব সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজ চক্রের কাছে আমরা জিম্মি।

সর্বোপরি যশোরের বিভিন্ন এলাকায় মেসের শিক্ষার্থীরা চরম আতংকের মধ্যে দিন পার করে। এবং বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যশোর সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারনা নিয়ে যাচ্ছে। তাই এ সকল সমস্যার আশু সমাধান চেয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যশোরের সচেতন মহল।

One thought on “বহুমুখি সমস্যায় যশোরের মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা

  1. আমি য়শোর পলিটেকনিকে পরালেখা করেছি। বারান্দািপারায় থাকতাম। আমাদের জোর করে মিছিলে নিয়ে য়েত।তারাই একদিন রাতে আমাদের সব মোবাইল,ফোন,নগদ টাকা নিয়ে য়াই। আর একজনকে কলম দিয়ে সারা শরিরটা ছিদ্র করে দিয়ে য়াই।খুব কষ্ট করে শেষ করছি। পরে এক মাসতান এর মেসে উঠছি। ওই মেসেই 2 বছর খুব ভালো ভাবে ছিলাম। মাসতান এর মেসে কেই এসে ভয় দেখালে উনিই ওদেরকে উলটা মেরে আসতেন। মাসতান হলেও উনার মেস ছিল রাজনৈতিক মুক্ত। ওনার জন্য এখনো দোয়া করি

মন্তব্য