গোপনে ভিডিও করে ব্লাকমেইল

অপরাধ ডায়েরী

প্রতি রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদনঃ অপরাধ ডায়েরীঃ পর্ব-০৮

শরিয়তউল্লাহ শুভ

যশোরের বসুন্দিয়া সিংগিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র পল্লব কান্তি (১৬)। তার দুই বন্ধু অপূর্ব ও ইশান। তাদের মধ্যে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। বলতে গেলে এক আত্মা তিন দেহ, একে অপরের হাঁড়ির খবর সবই জানতো। একে অপরের প্রেম ভালোবাসার বিষয়েও জানতো তারা।

পল্লবের বন্ধু অপূর্ব’র সঙ্গে একটি মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আর অপর বন্ধু ইশান এর প্রেম ছিল আরেকটি মেয়ের সাথে। পল্লবের বন্ধু অপূর্ব তার নানা বাড়িতে থাকতো। বন্ধু ইশান হঠাৎ একটি দাবী করে বসে তার কাছে।

প্রেমিকার সাথে একান্ত সময় কাটাতে ইচ্ছে হয় তার। তাই সে অপূর্ব’র কাছে আবদার করে বসে সে যেন একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়। বন্ধুর কথা ফেলতে পারেনি অপূর্ব। নানা বাড়ি দক্ষিণ পাশের একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয় সে। ওই ঘরে প্রেমিকাকে নিয়ে অন্তরঙ্গ সময় পার করে ইশান। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল।

তবে তাদের অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর সেই দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে বন্ধু পল্লব। এরপর ভিডিও দেখে বেশ কিছুদিন তামাশা করে এক পর্যায়ে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করে পল্লব। এ নিয়ে তাদের বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া হয়।

নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে অপূর্ব আর ইশান মরিয়া হয়ে ওঠে। অপরাধ লুকাতে একপর্যায়ে পল্লবকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। পরিকল্পনা মোতাবেক একদিন সন্ধ্যার দিকে পল্লবকে অপূর্ব’র নানা বাড়ির সেই ঘরে নিয়ে যায় তারা। সেখানে দুই বন্ধু মিলে পল্লবকে গলা কেটে হত্যা করে।

রাগের বশে হত্যা করে ফেললেও হত্যা করার পর তাদের হুশ ফেরে। এরপর তারা আলামত লুকাতে পল্লবের লাশ বস্তাবন্দি করে ঘরের মধ্যে ড্রেসিং টেবিলের নিচে একটি গর্ত করে পুতে রাখে। এদিকে পল্লবকে কোথাও খুজে না পেয়ে থানায় একটি নিখোঁজ জিডি করে তার পরিবার।

বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। নিখোঁজের ২৬ দিন পর ৯ নভেম্বর পুলিশ পল্লবের মোবাইল নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিং করে যশোরের বসুন্দিয়া এলাকায় সন্ধান পায়। পুলিশ পল্লবের বন্ধু অপূর্ব’র কাছে পল্লবের ল্যাপটপ খুঁজে পায়। কিভাবে নিখোঁজ পল্লবের ল্যাপটপ তার কাছে এল এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসে।

পুলিশ অপূর্ব আর ইশানকে গ্রেফতার করে। তারপর তারা তাদের জবানবন্দীতে বন্ধু পল্লব কে হত্যার লোমহর্ষক বর্ননা দেয়। পুলিশ তাদেরকে হত্যা মামলার আসামী করে আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তাদেরকে কারা হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এখনো তারা কারাগারেই আছে। পুরো ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ১৪ই অক্টোবর।

নতুন উপশহর এলাকার সারথী মিল এলাকার বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক। ২০ বছর বয়সী মেয়ে সৃজনীকে (ছদ্মনাম) নিয়ে চলছে তার সংসার। কিন্তু হঠাৎ তার পরিবারের ওপর একটি কালো থাবা পড়ে। মেয়ে সৃজনীকে প্রতিবেশী হোসেন আলী প্রায়ই উত্যক্ত করতো।

আমাদের দেশের আর পাঁচটি মেয়ের মত সৃজনীও প্রথমে প্রতিবাদ করেনি। এদিকে সৃজনীর দিক থেকে কোন সাড়া না পাওয়ায় লম্পট হোসেন আলী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সৃজনীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সে একটি উপায় খোঁজে।

সুযোগ বুঝে একদিন সৃজনীর গোসলের ভিডিও করে সে। এরপর লম্পট হোসেন আলী অপর একজনকে দিয়ে কুপ্রস্তাব দেয় সৃজনীকে। এছাড়াও হুমকী দেয় যদি সৃজনী তার কু প্রস্তাবে রাজি না হয় তবে সেই গোসলের ভিডিও ও ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে। এবার সৃজনী এসব ঘটনা তার বাবা-মাকে জানায়।

এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে সৃজনীর বাবা রাজ্জাকের সঙ্গে লম্পট হোসেন আলীর বাকবিত-া চলছিল। এরপর একদিন ফের কথা কাটাকাটি শুরু হলে লম্পট হোসেন আলী হুমকি-ধামকি দিয়ে গালিগালাজ শুরু করে। বিষয়টি সহ্য করতে না পেরে লম্পট হোসেন আলীকে একটি চড় মারেন রাজ্জাক।

এতে হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে রাজ্জাকের বুকে লাথি মারে সে। এতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান সৃজনীর বাবা রাজ্জাক। অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা রাজ্জাককে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতার করে লম্পট হোসেন আলীকে। বর্তমানে সে কারা হেফাজতে আছে।

এসব ঘটনা সামনে আসলে আমাদেরকে শিওরে উঠতে হয়। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়ক পাড়ি দিচ্ছে তখন মস্তিষ্ক বিকৃত একটি সম্পদ্রায়ও গড়ে উঠছে। ভেবে দেখতে হবে পল্লবের বন্ধু ইশান (১৯) বয়স অনেক অল্প। এ বয়সেই বান্ধবীর সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে তার আলাদা রুমের প্রয়োজন হচ্ছে।

প্রশ্ন হল এ যুব সমাজের এমন অবক্ষয়ের কারন কি? কেনইবা পল্লব তার প্রিয় বন্ধুকে ব্লাকমেইল করতে গেল। অপরদিকে সৃজনীর গোসলের ভিডিও করা লম্পট হোসেন আলীও তিনমাস ধরে ব্লাকমেইল করছিল। কিন্তু সামাজিক সম্মান বাঁচাতে নিরবে নিভৃতে গোপনে কোন মেয়ে যে আত্মসম্মান বলি দিচ্ছে কি না তার কোন গ্যারান্টি আছে ? খেয়াল করলে দেখা যায় ব্লাকমেইলের কারনেই দুজনকে হত্যার শিকার হতে হয়েছিল।

শুধু এখানেই শেষ নয়। আজ হোসেন আলী, মারুফ এবং আলিফের জীবন একটি স্পিডব্রেকারের সামনে এসে দাড়িয়েছে। তারা হয়ত একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পেয়ে জীবনকে রাঙিয়ে নিতে পারতো। কিন্তু এখন কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে তাদের জীবন পার করতে হচ্ছে। ব্লাকমেইলের এসব ঘটনায় পুলিশ খুব দ্রুত আমলে নিয়েছে।

শীঘ্রই হয়ত তারা চার্জশীট দিবে, আদালতে বিচার হবে, ভিকটিমরা ন্যায় বিচার পাবে। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও স্বজন হারানোর বেদনা পরিবারকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। এমন মস্তিষ্কবিকৃত জাতি আমরা চাই না। চাইনা আর কখনো ব্লাকমেইল ঘটুক আর হত্যার শিকার হয়ে কয়েকটি প্রাণ ধ্বংস হোক।

তাই নিজে সতর্ক হোন অপরকে সতর্ক করুন।

মন্তব্য