হত্যাকারী কিশোর

অপরাধ ডায়েরী

প্রতি রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদন : অপরাধ ডায়েরী : পর্ব-০৯

শরিয়তউল্লাহ শুভ

যশোরের মোটর পার্টস ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম সাফা। ভাড়া থাকতেন যশোর শহরের পশ্চিম বারান্দী পাড়া খালধার রোডের এক বাড়িতে। একদিন সন্ধ্যায় তার এইচএন নামক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মোতালেব হোসেন টুটুলকে সাথে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহের পূর্ব পাশে মাসুদ কম্পিউটার দোকানের সামনে যান।

নিশ্চিন্তে গিয়েছিলেন তিনি সেখানে। তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। গোধূলীর মৃদু আলো আকাশ থেকে সরে রাতের চাদরে আবৃত হচ্ছে যশোর। মসজিদ থেকে মুসল্লীরা ফিরছে, দোকানে দোকানে আগরবাতি ধূপকাঠি জ্বালাতে ব্যস্ত দোকানীরা। কিন্তু কে জানতো এমন পরিবেশের মধ্যেও একটুপর ঘটবে মর্মান্তিক ঘটনা।

সন্ধ্যা আনুমানিক পৌনে ৭ টায় মোটরসাইকেলযোগে মাসুদ কম্পিউটার দোকানের সামনে পৌঁছায় সাফা। মোটরসাইকেল থেকে নামার আগেই ওৎ পেতে থাকা দু’জন খুনী তার গলায় ধারালো অস্ত্র চালিয়ে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে।

তার চিৎকারে কর্মচারী মোতালেব হোসেন টুটুল মালিক সাফাকে নিয়ে দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু ভর্তি কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় থমকে যান কেন্দ্রীয় ইদগাহ এলাকাসহ যশোরের সাধারণ জনগন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলের আশেপাশে লাগানো সিসি টিভির ফুটেজ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে।

তারা সিসি টিভিতে দেখতে পায় মাসুদ কম্পিউটার দোকানের সামনে সাদা ও লাল রংয়ের শার্ট পরিহিত কমবয়সী দু’জন সাফাকে ছুরিকাঘাত করছে। এরপর তারা দ্রুত দড়াটানার দিকে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর কোতয়ালি থানায় ৩-৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন, নিহত সাফার ভাই জাহিদুল ইসলাম ।

মামলাটি আমলে নেয় পুলিশ। এ হত্যা মামলা কোতয়ালি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাগণ প্রযুক্তির মাধ্যমে হত্যাকারীদের সনাক্ত করেন। এরপর অভিযান চালিয়ে হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী রানা মোল্লা ও রাকিবকে গ্রেফতার করে ডিবি। পরে শহরের গাড়ীখানা রোডের একটি নির্বাচনী প্রচারণা অফিসের পিছনে পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে দুই লাখ টাকার চুক্তিতে ভাড়াটিয়া কিলার হিসেবে সাফাকে খুন করেছে তারা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো হত্যাকান্ডে অংশগ্রহনকারী ভাড়াটে এই দুই খুনির বয়স মাত্র ১৯ বছর। যশোরের রেলস্টেশন এলাকার গাড়োয়ানপট্টির মুরাদ হোসেন সাক্কুর ছেলে আব্দুল্লাহ খান। সে চাঁচড়া রায়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। সম্প্রতি তার সাথে বন্ধুদের বিরোধ চলে আসছিল।

একদিন সন্ধ্যায় তার বন্ধুরা আশিক, আকাশ, নয়ন, মাসুদ রানা ও তাওহিদুল ইসলাম যশোর বিমানবন্দর এলাকায় ঘুরতে যায়। এসময় বন্ধু আকাশকে আব্দুল্লাহ মোবাইল করে তাদের অবস্থান জানতে চায়। তারা বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা বলার পর সেখানে তাওহিদুল ইসলাম আছে বলে আব্দুল্লাহ জানতে পারে।

আব্দুল্লাহ এসময় তাওহিদুল ইসলাম এর উদ্দেশ্য করে গালি দেয়। তাওহিদুল গালির কথা শুনে রেগে যায়। রাগের বশেই সে আব্দুল্লাহকে খুন করার ইচ্ছা পোষণ করে। ইচ্ছানুযায়ী সহযোগী অন্যদের নিয়ে রেলস্টেশন এলাকায় আসে সে। স্টেশন এলাকার আজিজুলের চায়ের দোকানের সামনে এসে আব্দুল্লাহকে পেয়ে যায় তারা।

তখন কাছে থাকা চাকু দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে তারা পালিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহত আব্দুল্লাহর পিতা বাদী হয়ে ৫ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করে। মামলাটি আমলে নেয় পুলিশ। ওই রাতেই আব্দুল্লাহর বন্ধু আশিকুল ইসলাম আশিক, আকাশ হোসেন, নয়ন হোসেন ও মাসুদ রানাকে আটক করে পুলিশ।

আটককৃতদের পরদিন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। আর ঘটনার মূল নায়ক তাওহিদুল ইসলাম তার ফুফু বাড়ি অভয়নগরের প্রেমবাগে পালিয়ে ছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সেখান থেকে তাকে আটক করেন। এরপর তার দেখানো মতে বাড়ি থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চাকুটি উদ্ধার করে পুলিশ। সেও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়।

ভাবনার বিষয় হলো আটককৃত সকলেরই বয়স ১৫-১৬ বছরের মধ্যে। চাকু কোন অবৈধ অস্ত্র নয়। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্রোকারিজের দোকানগুলোত হরহামেশাই কিনতে পাওয়া যায় এসব চাকু। এরসাথে আবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে বার্মিজ চাকু। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই পাওয়া যায় মারাত্মক এসব অস্ত্র। যা খুব সহজেই উঠতি বয়সী ছেলেদের হাতে চলে আসে। তাহলে কি কিশোর অপরাধ বাড়তেই থাকবে?

এটা কারোরই কাম্য নয়। সুতরাং এধরনের অপরাধ যাতে না ঘটে সেজন্য সর্বপ্রথম সচেতন হতে হবে কিশোরদের পরিবারকে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কার সাথে মিশছে এসব তদারকি করতে হবে। তা না হলে কিশোর অপরাধ বাড়তেই থাকবে। যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের দিকে তাকালেই তার পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের ৪৫টি জেলার অন্তত ৩৫০ শিশু-কিশোর অপরাধীকে এই কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। প্রতিমাসে এই কেন্দ্রে ১৩০-১৪০ জন কিশোর অপরাধী আসছে। জামিন নিয়ে প্রতিমাসে বেরিয়ে যাচ্ছে ১১০-১২০ জন। এখানে আসা শিশু-কিশোরদের অধিকাংশই খুন, ধর্ষণ ও মাদক মামলার আসামি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ পুলিশের কাজ করবে। কিন্তু আমাদেরও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। বর্নিত দুটি ঘটনার অপরাধীরা সবাই কিশোর। তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে যা বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে খুবই শক্ত মামলা। এই কিশোরদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ হতে পারতো। তারাও সুন্দর করে জীবনকে সাজাতে পারতো।

দেশের মানবসম্পদে পরিনত হতে পারতো। কিন্তু ছোট বয়সে বড় একটি অপরাধ তাদেরকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নমজ্জিত করে রাখছে। তাই নিজে সতর্ক হোন, অন্যকে সতর্ক করুন। খারাপ আদর্শকে ভালো আদর্শ দ্বারা প্রতিহত করুন। সচেতনতা রুখে দিক সকল অপরাধ।

মন্তব্য