সদা সক্রিয় চোরচক্র

অপরাধ ডায়েরী

রবিবারের বিশেষ প্রতিবেদন: অপরাধ ডায়েরী: পর্ব-১১

শরিয়তউল্লাহ শুভ

টায়ার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নির্বাচনের আমেজ বইছে। যশোর শহরের সিটি কলেজ মার্কেটের ব্যাটারিপট্টিতে মেসার্স ট্রাক্টর অ্যান্ড স্যালো দোকানের মালিক গুলশান একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরলেন সেদিন।

বাড়ি যাওয়ার আগে ভালো করে দোকান বন্ধ করে যান। ভোর ৪টার দিকে ওই বাজারের নৈশ প্রহরী আব্দুর রাজ্জাক দেখতে পান ঐ দোকানের সামনের একটি বাল্ব ভাঙ্গা। ক্লবসিবল গেটে লাগানো ৪টি তালা কাটা। অন্য একটি তালা কাটতে না পেরে গেটের হ্যাজবোল্ট কাটা হয়েছে।

নৈশপ্রহরী দোকানে চুরির ঘটনা মোবাইল ফোনে দোকানের মালিক গুলশানকে জানান। তিনি দোকানে গিয়ে দেখেন দোকানের মধ্যে রাখা অটোরিকসার জন্য ৪শ’ ব্যাটারি নেই। এছাড়া ট্রাক, পিকআপ, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনের ব্যবহৃত ব্যাটারি নেই। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকার ব্যাটারি চুরি হয়েছে।

এরপর তারা দোকানের অদূরে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখতে পান, রাত ৩ টার দিকে একটি পিকআপ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানের সামনে ব্যাটারির প্যাকেট গুলো সাজানো রয়েছে। একদল লোক মালামাল গাড়িতে উঠাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে মালামাল কেনাবেচা হচ্ছে। যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে সে জন্য তারা কাগজপত্র দেখছে। পরে সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে মালামালগুলো পিকআপে করে নিয়ে চলে যায়।

পরদিন ছিল যশোর টায়ার ব্যবসায়ী মালিক সামিতির নির্বাচন। সেজন্য সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত দোকানের সামনে লোকজন ছিল। তাদের অনেকেই পিকআপ দেখেছেন। তারাও মনে করেছেন, মালামাল লোড আনলোড করা হচ্ছে।

কিন্তু দোকান ভেঙ্গে চুরি হচ্ছে তা কেউ বুঝতে পারেনি। ঘটনাটি চলতি বছরের আগস্ট মাসে ঘটে। যশোর শহরের কাপুড়িয়াপট্টি রোডের মতিয়ার সুপার মার্কেটের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘প্রিয়াঙ্গন জুয়েলার্স’। দোকানের স্বত্বাধিকারী অমিত রায় দুপুরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যান। বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই তার দোকানে চুরি হয়েছে বলে জানতে পারেন।

এসে তিনি দেখেন দোকানের তালা ভাঙা। এবং প্রায় ৩৭ ভরি সোনার গহনা চুরি হয়েছে। সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ৭/৮ জনের একটি চোরের দল স্বর্ণ চুরির কাজে অংশ নেয়। প্রথমে দোকানের সামনে কয়েকজন যুবক অবস্থান নেয়। এর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেখানে আরও কয়েকজন যুবক আসে।

এদের মধ্যে একজনের হাতে একটি বড় ত্রিপল ছিলো। ত্রিপল টানিয়ে প্রথমে তারা দোকানের সামনের অংশটি আড়াল করে নেয়। এরপর তালা ভেঙে দোকানের ভেতরে ঢোকে লাল গেঞ্জি ও মাথায় টুপি পরা এক যুবক। পরে সে নীল মাস্ক পরে ১০ মিনিটের মধ্যেই দোকান থেকে বিভিন্ন স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়।

কোতয়ালী মডেল থানার ২০ গজের মধ্যেই এমন দুধর্ষ চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সারাদেশের পত্রিকায় এমন দুধ্বর্ষ চুরির কথা ছাপা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এবটু চাপের মুখে পড়ে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কোতয়ালি থানার একজন সেকেন্ড অফিসারকে। কিন্তু মামলার কোন অগ্রগতি না হওয়ায় পরে মামলাটি পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কাছে তদন্ত করতে দেওয়া হয়।

মামলাটি গুরুত্বের সাথে আমলে নেয় ডিবি পুলিশ। দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে কয়েকজন চোরকে চিহ্নিত করতে পারে তারা। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী চোর চক্রের এক সদস্য চট্টগ্রামের আব্দুর রহিম বাদশা ও সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় দুজনের কাছ থেকে চুরি হওয়া তিন ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী চোর চক্রের সদস্য সুমন ও উজ্জলকে কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী অপরাধীরা কারা হেফাজতে ছিল। প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে তদন্ত করে এ মামলার রহস্য উদঘাটন করে যশোরের ডিবি পুলিশ। তারা জানতে পারে স্বর্ণ চোরদের একটি চক্র রয়েছে। তারা অনেক শক্তিশালী এবং সারাদেশে ছড়িয়ে আছে তাদের নেটওয়ার্ক। নেটওয়ার্ক যতই ছড়িয়ে থাকুক।

আইনের জালে অপরাধীদের আটকে পড়তে হয় এটাই স্বাভাবিক। অপরাধীরা অপরাধ করে। হয়তো কিছুটা সময় তারা আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আরামের জীবন অতিবাহিত করতে চায়। কিন্তু তারা ভূল কারন সকল অপরাধীদের সর্বশেষ আশ্রয় স্থান হয় কারাগার।“টীম অপরাধ ডায়েরী” যশোর ডিবি পুলিশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামীদেরকে গ্রেফতার এবং প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করার জন্য।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান। এদেশে সৎ উদ্দেশ্য থাকলে, সৎ ভাবে বেচে থাকার ইচ্ছে থাকলে একজন কুলিও সম্মানের সাথে বেচে থাকত পারে। কারন আজও আমাদের সমাজ শ্রমকে সম্মান করে। তাহলে কেন চুরি, ডাকাতি, রাহাজানির মত অপরাধ জগতকে বেছে নেওয়া? আমাদের সমাজ চোর বলে সাব্যস্থ হওয়া কাওকে গ্রহন করতে চায়না। এমনকি চুরির মামলায় জেলে থাকা কাওকে আইনী সহায়তার জন্যও তার আত্মীয় স্বজনরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়না।

এজন্য কম কষ্টে কোটিপতি হওয়ার লোভে যারা এধরনের অপরাধ জগতে পা দেয় তারা আদতে তাদের পরিবারকেই ভোগান্তিতে ফেলে।আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে যাতে পুলিশ ফাইল্সে এমন অপরাধের ঘটনা স্থান না পায়। তাই সতর্ক থাকুন, সাবধান হোন। খারাপ আদর্শকে ভালো আদর্শ দিয়ে প্রতিরোধ করুন।

মন্তব্য