পলিথিন দিয়ে তেল-গ্যাস তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন সোহাগ

প্রজন্ম ডেস্ক

মো. সোহাগ হাওলাদার। একজন ইজিবাইক মিস্ত্রি। তিনি পলিথিনের  বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া প্লাষ্টিকের বোতল টিনের ড্রামে ঢুকিয়ে আগুনের তাপ দিয়ে জ্বালানি তেল (পেট্রোল, ডিজেল, বিটুমিন), জ্বালানী গ্যাস এবং কালি তৈরি করে সাড়া ফেলেছেন।

তার এসব উদ্ভাবন এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন এলাকার সব বয়সি নারী-পুরুষ। এই উদ্ভাবন এলাকাজুড়ে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি করেছে। সোহাগ খুলনা নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া (হিন্দু স্কুল মোড়) ২ নম্বর ক্রস রোড এলাকায় বসবাস করেন।

তিনি স্থানীয় জোড়াকল বাজারে চায়ের দোকানে কাজ করতেন। সঙ্গে ইউসেপ স্কুলের কারিগরি বিভাগে ১৮ ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা তাকে বাধ্য করে পড়ালেখা বাদ দিয়ে কাজে নামতে।

মো. সোহাগ হাওলাদার জানান, আমি একদিন গ্যারেজের কাজ শেষে বাসায় দুপুরের খাবার খাচ্ছি। এখন সময় টিভিতে দেখতে পেলাম, একজন পলিথিন দিয়ে তেল উৎপাদন করেছে। আমি প্রতিবেদনটা ভালভাবে দেখি। আট মাস চেষ্টা করে পরে আমি সফল হই। তবে টিভিতে দেখেছি, সে তেলগুলো আলাদা করতে পারেনি। আর আমি পেট্রোল, ডিজেল, বিটুমিন প্রত্যেকটা আলাদা করতে পেরেছি।

গ্যারেজের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি এ কাজ শুরু করি। এ কাজের জন্য আমি তেলের এক বড় টিনের ড্রাম (ব্যারেল), ছোট দুই কন্টেইনার, চার ফুট স্টিলের সরু পাইপ ও কয়েক হাত প্লাষ্টিকের পাইপ কিনে কাজ শুরু করি। প্রথমে কিছু সমস্যা দেখা দিলে তা শুধরে নিয়ে এখন আমি সফল।

পরিত্যক্ত পলিথিন টিনের ড্রামে ভরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তাপ দেই। এরপর  ড্রাম থেকে নির্গত গ্যাস এবং জলীয় বাস্প পাইপ দিয়ে এসে প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে রাখা পানিতে শীতল হয়ে ছোট কন্টেইনারে জমা হয়। আর বাকী জ্বালানী গ্যাস ষ্টিলের পাইপ দিয়ে বেরি আসে।

সোহাগ বলেন, ১০ কেজি পলিথিন বর্জ্য দিয়ে ৬ লিটার পেট্রোল, ২ লিটার ডিজেল, ১ কেজি বিটুমিন, কেজি কালি এবং ১ কেজি জ্বালানী গ্যাস উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি। এ পেট্রোল দিয়ে  মোটরসাইকেল চালাচ্ছি, কোন সমস্যা হয়নি। পরিবেশের ক্ষতিকর এসব বর্জ্য কাজে লাগাতে পারলে, শুধু দেশ নয় সারা পৃথিবী উপকৃত হবে। কমবে জ্বালানী তেলের দাম। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ী মো. জাহিদ হোসেন উজ্জ্বল জানান, পলিথিন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। সেই পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন করছে। এতে করে একদিকে যেমন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে বাড়তি জ্বালানি। তার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন শুরু করা যেতে পারে। এ জন্য সরকারি পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা জানান, পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল তৈরি করা যায়, সেটা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। ছোট বেলা থেকে সোহাগ এখানে বড় হয়েছে। সে মেধাবী কিন্তু অভাবের কারণে পড়ালেখা করতে পারেনি। আর সে এখন এমন এক জিনিসি তৈরি করলো, যা সকলকে অবাক করে দিয়েছে। তবে সরকারের একটুখানি সহযোগিতা পেলে সে হয়তো দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারতো।

নষ্ট পলিথিন এবং প্লাষ্টিক পরিবেশের জন্য হুমকি। যা মাটিতে থাকলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে আবার আগুনে পোড়ালে পরিবেশের ক্ষতিকর অতিরিক্ত কার্বন তৈরি করে। নষ্ট করে পরিবেশের ভারসাম্য। সেই সব পলিথিন বর্জ্য এবং প্লাস্টিক এখন সম্পদে পরিণত করছেন স্বল্পশিক্ষিত মো. সোহাগ হাওলাদার। তার এ উদ্ভাবনীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে স্থানীয় ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজমল আহমেদ তপন জানান, পলিথিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক দিয়ে সোহাগ হাওলাদারের জ্বালানি তেল ও গ্যাস তৈরির বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে, এ পদ্ধতি আসলে পরিবেশ বান্ধব কি-না, বা প্রক্রিয়াটি কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য তা আরো ভালো করে দেখতে হবে। ভালো হলে  সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তাকে সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারেন।

মন্তব্য