প্রকাশ্যে ঘুরছে সাংবাদিকদের উপর হামলার মূলহোতা, খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ!

প্রজন্ম ডেস্ক

 টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি ফজল মন্ডলসহ মূলহোতারা প্রকাশ্যেই ঘুরাফেরা করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু পুলিশ বলছে আমরা তাকে খুঁজে পাচ্ছিনা। তবে গ্রেফতারে সর্বাত্বক চেষ্টা চলছে।

অভিযুক্ত ফজল মন্ডল উপজেলার গোবিন্দাসী এলাকার মৃত আব্দুল কাশেমের পুত্র। তিনি গোবিন্দাসী ইউনিয়ন ট্রাক শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা।

জানা গেছে, গোবিন্দাসী ঘাট সংলগ্ন কাশবন এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ফজল মন্ডলের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর চলে আসছে। টাঙ্গাইল জেলার বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক জুয়াড়ি সেখানে নিয়মিত জুয়া খেলতে আসতো। অথচ থানা পুলিশ নাকি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।

এমন খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে সংবাদ সংগ্রহে গেলে ৪ সাংবাদিকসহ ৬ জনের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালায় জুয়াড়িরা। এসময় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ক্যামেরা ও বুম (মাইক্রোফোন) ভাঙচুর করা হয়।

এ ঘটনায় রাতেই জুয়াড়িদের হামলার শিকার সাংবাদিক সোহেল তালুকদার বাদি হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নামে ভূঞাপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ জন এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজল মন্ডলসহ হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রভাবশালীরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মামলার পর কয়েক ঘন্টার জন্য ফজল মন্ডল গা ঢাকা দিলেও বেশিরভাগ সময়ই এলাকায় ঘুরাফেরা করছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে গভীর রাত অবধি বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিয়েছেন। একই দিন এলাকার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা গেছে। এছাড়া আজ সকালেও টি-রোডে তিনি চা খেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এদিকে সাংবাদিকদের উপর হামলার পর একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে তার সব কৃতকর্ম। শুধু জুয়ার আসর নয়, ফজল মন্ডলের বিরুদ্ধে রয়েছে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ। গোবিন্দাসীর টি রোড ও জিগাতলা মোড়ে অবৈধভাবে বালুর ট্রাক প্রতি চাঁদা নেওয়া হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, লোজজন দিয়ে ট্রাক থেকে এই টাকা আদায় করা হলেও উপর থেকে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন প্রভাবশালী এই ফজল মন্ডল। কাউকেই তোয়াক্কা করেন না তিনি। একারণে প্রতিদিন শত শত গাড়ি থেকে দিনে-রাতে এভাবে চাঁদা আদায় করলেও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পায়না কেউ।

সূত্র জানায়, দিনের পর দিন ‘যৌথ ট্রিপ সিরিয়াল’ টোকেনের নামে এসব চাঁদা নেওয়া হচ্ছে৷ টাঙ্গাইল জেলা ট্রাক মালিক সমিতি ও জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নাম উল্লেখ করে টাকা নেওয়া হলেও টোকেনের গায়ে উল্লেখ নেই কোনো টাকার অঙ্ক!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক চালক সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, কেউ টাকা দিতে অপারগতা করলে অথবা টাকা কম দেওয়ার চেষ্টা করলে ফজল মন্ডলের লোকজন গাড়ির লুকিং গ্লাস ভাঙচুরসহ ট্রাক আটকে রাখেন।

জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে ভূঞাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রাশিদুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো দিনের বেলায় তারা ভ্রাম্যমাণ হিসেবে ঘোরাফেরা করছেন। তবে রাতে কোনো আসামি বাড়িতে থাকেন না। এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সবাইকে ধরা এতো সহজ কাজ নয়।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সঞ্জিত কুমার রায়ের সঙ্গে। তিনি মুঠোফোনে সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ফজল মন্ডল নাকি আরও বড় কেউ সেটি বিষয় নয়, অপরাধী যেই হোক বা যতবড় প্রভাবশালীই হোক তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, মামলার পরপরই তিনজন এবং গতকাল বিকালে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বাকি আসামীদের গ্রেফতারে একেরপর এক অভিযান অব্যহত রেখেছে। তারা কেউ বাড়িতে থাকছেন না। তবে কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করবে।

চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে সেটি বৈধ ইজারাদারের মাধ্যমে নাকি অবৈধভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে তা তদন্ত করে দেখতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলাও সংযুক্ত করা হবে।

উল্লেখ্য, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ঘাট সংলগ্ন কাঁশবন এলাকায় জুয়ার আসরের সচিত্র সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে জুয়াড়িদের হামলায় আহত হন ডিবিসি টেলিভিশনের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি সোহেল তালুকদার, ক্যামেরা পারসন আশিকুর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক অভিজিৎ ঘোষ ও স্থানীয় সাংবাদিক মোহাইমিনুল মন্ডলসহ নৌকার দুই মাঝি।

এদিকে, সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসীর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায় ভূঞাপুর প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি প্রেসক্লাব চত্বর থেকে পৌর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে থানার মোড় চত্বরে মানববন্ধন পালন করা হয়।

এসময় বক্তারা বলেন, সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর জুয়াড়িদের হামলা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। জুয়াড়ি সন্ত্রাসীদের মূলহোতাসহ আসামিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়। অন্যথায় সাংবাদিকরা আরো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

মন্তব্য