আত্মহত্যা

অপরাধ ডায়েরী

প্রতি রবিবার এর বিশেষ আয়োজন ‘‘ অপরাধ ডায়েরী ’’ পর্ব-১৪

শরিয়তউল্লাহ শুভ

মহিমা খাতুন সেতু যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার হাজিরালী মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। বাড়ি মনিরামপুর থানার স্মরণপুর গ্রামে। হাইস্কুলে পড়াকালীন সময় থেকে একই এলাকার মোস্তাফিজুর রহমান অপুর সাথে সেতুর প্রেমজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এরপর এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফল প্রকাশের পর সেতু ঝিকরগাছার হাজিরালী মহিলা কলেজে ভর্তি হয়। এর কিছুদন পর সেতু পরিবারের অমতে গোপনে অপুকে বিয়ে করে। কিন্তু এসব ঘটনা কখনো চাপা থাকে না। এক কান দুই কান হয়ে বিষয়টি দুই পরিবারের অভিভাবকরা জানতে পারে। কিন্তু অপুর বাবা মা এ বিয়ে মেনে নিতে পারেননি।

বিয়ে হলেও যাতে সেতুকে ভূলে যেতে পারে এজন্য অপুকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয় অপুর বাবা। কিন্তু সেখান থেকেও সেতুর সাথে ফোনে যোগাযোগ করতো অপু। এক পর্যায়ে বেশিদিন বিদেশে থাকতে পারেনি অপু। কয়েক মাস পর দেশে ফেরত আসে সে। এরপর প্রায়ই সেতুদের বাড়িতে আসা যাওয়া করতো অপু।

সেতুর বাড়িতে যাওয়া আসা করতে দেখে অপুকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে অপুর বাবা মা। পরে জোর করেই অপুকে বিয়ে দেয় তারা। এদিকে স্বামী অপুর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে পারেনি সেতু। তাই সে অপুদের বাড়িতে যায় এবং অপুকে দ্বিতীয় বিবাহ করার কারণ জিজ্ঞাসা করতে থাকে। এ সময় অপু ও তার বাবা মা সেতুর সাথে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।

সেতুকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহন না করে অন্যত্র বিয়ে করায় পরিবার ও এলাকায় লোকজনের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না ভেবে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সেতু। এবং লাল কালি দিয়ে স্বামী অপুকে একটি চিঠিও লিখে যায় সে। জীবনযুদ্ধে হার মেনে যাওয়া সেতুর একটাই অপরাধ ছিল। সে গরীব দিন মজুরের মেয়ে।

এ ঘটনায় সেতুর ভাই অপু ও তার পিতা মাতার বিরুদ্ধে মনিরামপুর থানায় একটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করে। পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়। তবুও দীর্ঘ ছয় মাস তদন্ত শেষে মনিরামপুর থানার একজন এসআই মামলার চার্জশীট দাখিল করে, যেখানে অপুর পিতামাতাকে মামলা হতে অব্যহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি সকল স্বাক্ষীর সাক্ষ্য হুবহু এক হয়ে যাওয়ায় চার্জশীটটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এজন্য সেতুর ভাই আদালতে একটি নারাজী পিটিশন দাখিল করে। একইসাথে মামলাটি পুনঃ তদন্তের জন্য পিবিআই অথবা সিআইডির কাছে হস্তান্তর করার প্রার্থনা করে। আদালত নারাজী পিটিশনটি আমলে নেয় এবং মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পিবিআই’র কাছে হস্তান্তর করে। পরে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) যথাযথ তদন্ত করে পূর্বক চার্জশীট প্রদান করে। পিবিআই এর তদন্তে অপু ও তার পিতামাতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৬ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমানিত হয়।

আদালতে যদি এ অপরাধ প্রমাণিত হয় তাহলে আসামীদের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদন্ড হতে পারে। যদি অপুর বাবা মা ছেলের অপরাধ মার্জনা করে গরীব সেতুকে বৌমা হিসেবে মেনে নিত তাহলে হয়ত আজ গল্পটি অন্যরকম হতে পারত। আজকে পরিবারের সবার নাম পুলিশ ফাইল্সে ঠ্াঁই পেত না। ভাবতেও অবাক লাগে বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের চিন্তা চেতনা এখনো কত নীচু যে, গরীব বলে একটা মেয়ের জীবনকে আমরা ধ্বংস করে দেই।

এই পর্বে ২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পূনরায় সকলের সামনে আজ উপস্থাপন করলাম। কারন এই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা বর্তমানে বেড়েই চলেছে। কেও প্রেমের কারনে, কেও সম্মানহানি হয়ে, কেও পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হয়ে, কেও অভিমান করে আর কেওবা রাগের বশবতী হয়ে আত্মহত্যা করছে।

কিন্তু আত্মহত্যাই কি শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত? একটু কি ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা কি করা যায় না ? একটু কি পরিবারের অন্যদের কথা চিন্তা করা যায় না? একটু কি ভাবা যায় না জীবনকে এবার একটু অন্যভাবে সাজানোর চেষ্টা করি ? কিন্তু আমরা এগুলো করি না। কারন আমাদের মনে আত্মবিশ্বাসের বড়ই অভাব।

আমাদের পরিবর্তন দরকার। আমাদের মানষিকতার পরিবর্তন দরকার। আজকের এই পর্বটি যারা পড়ছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, সুখ আর দুঃখ মিলিয়েই মানুষের জীবন। জীবনের চরম ক্রান্তিলগ্নেও বেঁচে থাকতে হবে।

সবার জীবনেই খারাপ সময় আসে। নিজের মানষিকতা পরিবর্তন করুন অন্যকে পরিবর্তন করুন। খারাপ আদর্শকে ভালো আদর্শ দ্বারা প্রতিহত করুন।

মন্তব্য